Powered By Blogger

বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২

দ্য লোডশেডিং রিটার্নস

রতিবছর আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে লোডশেডিং। লোডশেডিংকে আমরা আর হারাতে চাই না। হূদয়গ্রাহী পারফরম্যান্সের জন্য একে ‘গোল্ড মেডেল’ দেওয়া উচিত। আমাদের শোবার ঘরে ‘নিরাপত্তা’ ঢুকতে না পারলেও ‘লোডশেডিং’ ঠিকই ঢুকে বসে থাকে! সময় মেনে, নিয়ম মেনে আসা-যাওয়া করে। জাতীয় জীবনে তার অবদান কতটা awesome, তা জানাতেই মোমবাতির আলোয় বসে এই লেখা লিখছি।
এ যুগে ‘অ্যানালগ সামাজিকতা’ বিরল বস্তু। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কল্যাণে তা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। লোডশেডিংয়ের সময় গরমে ‘হিট স্ট্রোকের’ ভয়ে রাত-বিরাতে অনেকে বাসা থেকে বের হয়। ফলে প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আবার বসতবাড়ির চারপাশে এই লোকসমাগম হওয়ায় চোর-ছেঁচড়দের উৎপাত কমে গেছে। পরিণামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে কেউ কেউ চলে যায় ছাদে। জ্যোৎস্নার আলো খেতে খেতে অণুকাব্য রচনা করে। এভাবে সামষ্টিক সুকুমারবৃত্তির চর্চা হওয়ায় ‘লোডশেডিংয়ের রাজ্যে পৃথিবী পদ্যময়’ হয়ে ওঠে!
ছুটির দিনেও লোডশেডিংয়ের কর্মতৎপরতা আমাদের আবেগাপ্লুত করে! এ থেকে আমরা কর্মঠ হওয়ার শিক্ষা পাই। কিন্তু এতটুকু শিক্ষা দিয়েই সে ক্ষান্ত হয় না। রাতে খেয়েই যাঁদের ঘুমানোর বদভ্যাস রয়েছে, তাঁদের মহৌষধ লোডশেডিং। বিছানায় শোয়ামাত্রই বিদ্যুৎ চলে যায়। বাধ্য হয়ে তাঁরা বিছানা থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করেন। এভাবে জাতীয় সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া ভ্যাপসা গরমে মধ্যরাতে বীরদর্পে ঘরে ঢুকে পরের দিনের কাজের জন্য লোডশেডিং আমাদের ‘ওয়ার্ম আপ’ করে!
দেশে চলছে হিন্দি সিরিয়ালের আগ্রাসন। তাই দরকার আমাদের সংস্কৃতির পুনর্বাসন। লোডশেডিংয়ের ঝাকানাকা অবদানে আমরা শিগগিরই ফিরে পাব হারানো সিংহাসন! কারণ বিদ্যুতের অভাবে হিন্দি চ্যানেল দেখা যায় না, যদিও অন্যান্য চ্যানেলও পটল তোলে। অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের ফলে আমাদের অজুহাত দেওয়াও অনেক সহজ হয়েছে! অন্ধকারে ঠিকমতো রান্না করা যায় না—এই অজুহাতে গিন্নিরা রান্না থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন। একই অছিলায় হোমওয়ার্ক না করেও পার পেতে পারে ছাত্রছাত্রীরা। কয়েকটি সিম দিয়ে যারা একাধিক প্রেম করে, তারা মোবাইল বন্ধের জন্য প্রেমিকাদের কাছে সহজেই কৈফিয়ত দিতে পারে, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে মোবাইলে চার্জ ছিল না।’ লোডশেডিং আমাদের ধৈর্য বাড়াতেও অবদান রাখছে। এত লোডশেডিংয়ের মধ্যেও আমরা যে হাসিমুখে সময় কাটাচ্ছি, এটা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্য, যান চলাচল ইত্যাদিতে চরম অনিয়ম সত্ত্বেও আমরা হেসেখেলে জীবন পার করছি। এ জন্য আমাদের প্রত্যেকের নাম ‘রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট’-এ অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
পৃথিবীতে শক্তির অপচয় রোধে কত কিছুই না করা হচ্ছে! শক্তির এই অপচয় রোধে আমরা প্রতিনিয়ত দৃষ্টান্ত তৈরি করে চলেছি। এটা সম্ভব হচ্ছে লোডশেডিংয়ের ফলেই। আরেকটু চেষ্টা করলেই আমরা লোডশেডিংয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি। তখন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে আমাদের কিছুই যাবে-আসবে না! তদুপরি, লোডশেডিংয়ের বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে পারলে অতিরিক্ত লোডশেডিং বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা যেতে পারে! যুগে যুগে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কত কিছু আবিষ্কার করা হয়েছে। তেমনি একটু খাটুনি খাটলেই লোডশেডিং ব্যবহার করেও হয়তো নতুন কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব হবে!
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজের জন্য অল্প হলেও বিদ্যুতের প্রয়োজন। যেমন, ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেটিং। অভিমানের সুরে নয়, অভিযোগের তালে বলছি, দূর-দূরান্ত থেকে আসা ‘অতিথি বিদ্যুৎ’ আমাদের দরকার নেই। বায়োগ্যাস বা সোলার প্যানেলের সাহায্যে আমরা ল্যাপটপে চার্জ দিতে পারি। বিদ্যুৎহীনতায় যাঁদের ব্যবসায় লালবাতি জ্বলেছে, তাঁরা কাছা মেরে আইপিএসের ব্যবসায় নেমে পড়ুন। দরকার হলে আইপিএস ব্যবহার করব; তবুও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিদ্যুৎকে আমরা ঘরে ঢুকতে দেব না। আসুন, আমরা স্বাগত জানাই লোডশেডিংকে। বৈশাখ আসার আগেই গেয়ে উঠি, ‘এসো হে লোডশেডিং, এসো এসো!’

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-04-09/news/238964

শুক্রবার, ২৪ আগস্ট, ২০১২

বাড়ি আমার, আমি বাড়িতে থাকি, কিন্তু বাড়ির কাজকর্মে আমার কথা চলে না।...

জাতির জীবনে এটা একটা কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমাদের সরকার গরিব মহিলাদের মালিকানায় এবং তাদেরই তত্ত্বাবধানে সুপরিচালিত বিশ্বময় সুপরিচিত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তার মৌলিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে অন্য রকম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করল। এ দুঃখ ধারণ করার ক্ষমতা আমার নেই।
কী করেছিল গ্রামীণ ব্যাংক, যার জন্য তাকে তার মৌলিকত্ব হারাতে হলো?
৮০ লাখ গরিব মহিলা নিজেদের অর্থে শেয়ার কিনে এটার মালিকানায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। ৯৭ শতাংশ মালিকানা তাদের। সরকারের মালিকানা ৩ শতাংশ। নিজেদের পয়সায় পরিচালিত এই ব্যাংক একটা বৃহৎ সমবায়ের মতো। এটা নিজের অর্থে চলে। সরকার বা বিদেশ থেকে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এটা কোনো ঋণ নেয় না, অনুদান নেয় না। তবু কেন বিশ্বব্যাপী বহুলভাবে অনুকরণকৃত এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এই প্রতিষ্ঠানকে সরকারের অন্য দশটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলো?
সরকার বলছেন যে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এই অচলাবস্থা কে সৃষ্টি করেছিল? ব্যাংকের মালিকেরা আইনগত প্রক্রিয়ায় একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য সিলেকশন কমিটি গঠন করেছিলেন। যেহেতু এই সিলেকশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁরা আমার নাম এবং অন্যান্য সদস্য হিসেবে ড. আকবর আলি খান এবং জনাব খালেদ শামসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন, সরকারের প্রতিনিধি, বোর্ডের চেয়ারম্যান এই প্রস্তাব বোর্ডের সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ থাকেন। অদ্ভুত পরিস্থিতি। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ডে ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা আইন কাউকে দেয় নাই। চেয়ারম্যান সাহেব গায়ের জোরে ভেটো দিয়ে যেতে থাকলেন পর পর তিনটি বোর্ড মিটিংয়ে। একেই বলা হচ্ছে অচলাবস্থা। তার জন্য এখন আইন সংশোধন করে পুরো ব্যাংকের ভবিষ্যৎটাই মূলত চেয়ারম্যান সাহেবের হাতে তুলে দেওয়া হলো।
সরকার থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ‘আমরা গ্রামীণ ব্যাংক দখল করিও নাই, করতে যাচ্ছিও না। ইউনূস সাহেব মিথ্যাচার করছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকদের কর্তৃত্ব আগের মতোই আছে। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই চেয়ারম্যান সিলেকশন কমিটি গঠন করবেন।’ পরামর্শ কখন করে, আর ভোট কখন নেয়? যখন ক্ষমতা একজনের হাতে থাকে তখন পরামর্শ করে। ভোট নেয় যখন ক্ষমতা ভোটদাতাদের কাছে থাকে। গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশ সংশোধন করে এখন মালিকদের ভোটদানের ক্ষমতা রহিত করে তাদেরকে ‘পরামর্শ’ দেওয়ার ভূমিকায় রাখা হলো। তারপর একক চেয়ারম্যান কর্তৃক তৈরি সিলেকশন কমিটি তিনটি নাম বোর্ডের কাছে দেবে। বোর্ডের সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ থাকবে যে এই প্রার্থীরা চেয়ারম্যানের চোখের দিকে তাকিয়ে কাজ করবেন। মালিকদের চোখের দিকে তাকিয়ে কাজ করবেন না। যাঁকেই তাঁরা নিয়োগ দিন না কেন, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
যে বোর্ডের কাছে সমস্ত ক্ষমতা আগের মতোই রয়ে গেছে বলা হচ্ছে, সে বোর্ড কিছু জানার আগেই সরকার থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে বোর্ড সদস্যরা যা চাচ্ছেন তা হতে দেওয়া হবে না। কেন হতে দেওয়া হবে না? কারণ ক্ষমতা সরকারের হাতে। সরকার বলছে ‘সিলেকশন কমিটি’ এক সপ্তাহের মধ্যে হয়ে যাবে। এটা কি বোর্ডের কথা, নাকি সরকারের কথা? এবং তাতে ইউনূস থাকবে না। কারণ কী? কারণ সরকার এটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। এটা কি বোর্ডের সিদ্ধান্ত? ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন আকর্ষণীয় অঙ্কের হবে, তা না হলে আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওয়া যাবে না। এটা কি বোর্ডের সিদ্ধান্ত?
অথচ সরকার বলেই যাচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। সরকার আইন সংশোধনের আগেই এত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, আইন সংশোধনের পরে কী হয়, এবার আমাদের দেখার পালা।
আইনে সংশোধনী এনে সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নিয়োগে ভূমিকা রেখে প্রকারান্তরে গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার দায়দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিল। দুনিয়ার কোথাও নজির নাই যে বহুজনের ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ক্ষমতা ৩ শতাংশ মালিকানার অংশীদারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশ সংশোধনের ব্যাপারে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর আমি দেশের মানুষের প্রতি আবেদন জানিয়েছিলাম সরকারকে বোঝানোর জন্য, যাতে সরকার এই সংশোধনের পথে অগ্রসর না হয়। দেশের বহু মানুষ বিবৃতির মাধ্যমে, সভা ও মানববন্ধনের মাধ্যমে, গণমাধ্যমে আলোচনা ও লেখালেখির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিশেষ করে, দলমত-নির্বিশেষে দেশের বহু সম্মানিত মহিলা নেত্রী এ ব্যাপারে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। গরিব মহিলাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমি তাঁদের সকলকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শুধু দুঃখ রইল যে সরকার আমাদের কারও কথা শুনল না।
এই সংশোধনীর ফলে গ্রামীণ ব্যাংকের গৌরবময় ইতিহাসের সমাপ্তি পর্বের সূচনা হলো। এখন থেকে গরিব মহিলাদের মালিকানার ব্যাংকটি সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে পরিচালিত হবে। ইতিহাসে নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না যে এ রকম পদক্ষেপের ফলে প্রতিষ্ঠানের মঙ্গল হয়েছে।
আমি আমার দুঃখ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। গ্রামীণ ব্যাংকের অসংখ্য কর্মী সারা জীবন পরিশ্রম করে একটি স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য এই ব্যাংকটিকে দুনিয়ার একটা অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছিল। আজ এর সমাপ্তি হতে দেখে তারাও তাদের দুঃখ রাখার জায়গা পাচ্ছে না।
যে গরিব মালিকেরা তাদের নগদ পয়সা দিয়ে এটার শেয়ার কিনে এটাকে ‘আমাদের ব্যাংক’ হিসেবে জানতে শিখেছিল, গৌরব করতে শিখেছিল, তারা এখন জানবে যে এটা এখনো তাদের ব্যাংক বটে তবে এর ব্যাপারে মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন
তাদের হাতে নেই। বাড়ি আমার, আমি বাড়িতে থাকি, কিন্তু বাড়ির কাজকর্মে আমার কথা চলে না।
আমি আশাবাদী মানুষ। আমি হতাশ হতে চাই না। নিজের মনে আশার ক্ষীণ আলো জাগিয়ে রাখতে চাই। আমি আগের মতো আবারও দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানাচ্ছি যে, তাঁরা যেন এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করেন। আমি দেশের তরুণদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন একদিন গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকদেরকে এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে। গরিব মালিকদের পরিবারের তরুণেরাও যেন এই প্রতিজ্ঞা করে যে, তাদের মায়েদের সম্পদ তারা তাদের মায়েদেরকে ফেরত এনে দেবে। তাদের ব্যাংক তাদের কাছে যেন আবার পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরে আসে। আশা করি ভবিষ্যতে একদিন আমাদের দেশে এমন সরকার আসবে, যাদের প্রথম কাজ হবে, একটি জাতীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গরিব মহিলাদের এই ব্যাংকটিকে গরিব মহিলাদের হাতে তুলে দিয়ে এই ব্যাংকের গৌরবময় অগ্রযাত্রাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। সেদিন দেশের সকল মানুষ স্বস্তি পাবে, গরিব মহিলাদের মঙ্গলকামী পৃথিবীর সকল মানুষ স্বস্তি পাবে।
আজ দুঃখের দিনে সে রকম একটি সুখের দিনের কথা চিন্তা করা ছাড়া মনকে সান্ত্বনা দেবার আর কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।
 ড. মুহাম্মদ ইউনূস: গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী।
 
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-08-24/news/283340

শুক্রবার, ৬ জুলাই, ২০১২

আওয়ামী লীগের পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে?

পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় হচ্ছে। ঋণচুক্তি বাতিল হওয়ার পর জনদরদি মহাজোট সরকার বিশ্বব্যাংক যে কত বড় দুর্নীতিবাজ, তা প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছে। পৃথিবীর কোন দেশের নামকরা অর্থনীতিবিদ বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছেন, কোন পত্রিকা কী প্রতিবেদন করেছে, তার ফিরিস্তি দিচ্ছেন মন্ত্রীরা। বিশ্বব্যাংক যদি এত খারাপ প্রতিষ্ঠানই হয়ে থাকে, তাহলে ঋণচুক্তি করার আগে কেন দেশবাসীকে সে সম্পর্কে কিছু জানানো হলো না? কেন জনগণকে জিজ্ঞাসা করা হলো না, এই বদনামি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমাদের চুক্তি করা ঠিক হবে কি না? ঋণচুক্তি বাতিলের পর জাতীয় সংসদের উপনেতা সাজেদা চৌধুরী তো বলেই ফেলেছেন, ‘এক বেলা বাজার না করে সেই পয়সা দিয়ে পদ্মা সেতু করবেন।’ কিন্তু বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপনের আগে কেন এ আহ্বান জানালেন না তিনি? তখন যদি এক বেলা বাজার না করে (মাননীয়ার কাছে জানতে চাই, বাংলাদেশের কতজন মানুষ দিনে দুই বেলা বাজার করে?) নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার কথা বলতেন, মানুষ বিশ্বাস করত। এখন বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে স্বদেশপ্রেমের মশাল জ্বালালে তাতে ঘর আলোকিত হওয়ার চেয়ে পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
এ গেল মুদ্রার এক পিঠ। অপর পিঠে যাঁরা আছেন, তাঁদের ধারণা, পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিল হওয়ায় দেশের মহাসর্বনাশ হয়ে গেছে। দেশের ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। কথাটি ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্বব্যাংককে মানুষ একটি বেনিয়া প্রতিষ্ঠানের বাইরে কিছু দেখে না। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের চিঠি গোটা দেশের জন্য অপমানকর। বিশ্বব্যাংকের চিঠি যদি অপমানকর হয়ে থাকে, চুক্তি সই করেও যাঁরা টাকা আনতে পারেননি, তাঁদের জন্য অপমানকর। সারা দেশের মানুষের জন্য নয়। এ অপমান তাঁদেরই প্রাপ্য, যাঁরা দুষ্কর্ম করেছেন বা করতে চেয়েছিলেন এবং যাঁরা তাঁদের রক্ষা করতে চাইছেন।
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেত্রী জাতীয় সংসদে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে যা বলেছেন, তা স্ববিরোধিতাপূর্ণ। একদিকে তিনি বলেছেন, বিশ্বব্যাংক যেহেতু এক পয়সাও দেয়নি, সেহেতু দুর্নীতির প্রশ্নই আসে না। বিশ্বব্যাংক কখনোই বলেনি যে ঘুষের লেনদেন হয়েছে। তারা বলেছে, কানাডীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঘুষ চাওয়া হয়েছে। আর ঘুষ যদি না-ই চাওয়া হবে, তাহলে তিনি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবকে কেন সরালেন? প্রকল্প পরিচালককে কেন সরালেন? প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, যদি প্রমাণিত হয় মন্ত্রী দায়ী, তাঁকে অপসারণ করা হবে। তদন্তের পরই প্রমাণ পাওয়া যাবে মন্ত্রী দুর্নীতি করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন কি না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সমর্থন করি। এখনো বিষয়টি তদন্তাধীন। অতএব, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মন্ত্রিসভার বাইরে রাখুন। যদি তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে আবার পুনর্বহাল হবেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মন্ত্রীর পদে রেখে (তা যে মন্ত্রণালয়েই হোক না কেন) সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হতে পারে না। এ কথাটি কেবল বিশ্বব্যাংকের নয়, বাংলাদেশের মানুষেরও। রেলওয়ের অর্থ কেলেঙ্কারির জন্য যদি রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করতে পারেন, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী পারবেন না কেন? মহাজোটের শরিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং আওয়ামী লীগের নেতা মোহাম্মদ নাসিমও বলেছেন, সৈয়দ আবুল হোসেনের সরে দাঁড়ানো উচিত। তাঁরাও কি বিশ্বব্যাংকের দালাল?
তবে এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, বিশ্বব্যাংকের ঋণ না পেলেও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। যেসব দেশে বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয় না, সেসব দেশ ধ্বংস হয়ে যায়নি; বরং বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিয়ে স্বনির্ভর হয়েছে, এ রকম উদাহরণই কম। তারা অনেক সময় এমন সব প্রকল্প চাপিয়ে দেয়, যা মানুষের উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করে। তাই বিশ্বব্যাংকের ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করা নিয়ে বিরোধী দলের শোরগোল তোলার যুক্তি আছে বলে মনে করি না। কিন্তু সেই ‘বিতর্কিত’ প্রতিষ্ঠানটি যখন আমাদের সরকারের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে কিংবা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে, তখন লজ্জায় মাথা কাটা যায়।
পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করলেও সেতু নির্মাণের কাজ ঠেকে থাকবে না। বাংলাদেশের মানুষের জন্য দরদ উথলে ওঠার জন্য বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয় না, তারা ঋণ দেয় ব্যবসা বাড়ানোর জন্য। বিশ্বব্যাংকের ঋণের পেছনে যে বড় রাজনীতি আছে, তাও ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের সরকারগুলো কখনোই মেরুদণ্ড খাড়া করে দাঁড়াতে পারে না, তারা নির্দ্বিধায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ন্যায্য-অন্যায্য সব শর্তই মেনে নেয়।
সরকারের মন্ত্রীরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার কথা বলছেন। আমরা এ-ও জানি, এই সরকারের অনেক মন্ত্রী-এমপি নিজস্ব অর্থায়নেও এ রকম একাধিক পদ্মা সেতু করতে পারেন। দেশি-বিদেশি ব্যাংকে সেই পরিমাণ অর্থ তাঁদের জমা আছে। কিন্তু তাতে বিশ্বব্যাংক সরকারের গায়ে যে কালিমা লেপন করল, তা মুছে যাবে না। অতএব, বিশ্বব্যাংক নয়, সরকার ও জনগণের স্বার্থেই দোষীদের শাস্তি দিতে হবে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশের মানুষ যে দলটিকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কারণে প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই দলটিই এখন মহাজোট সরকারকে মহাদুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করছে। সরকারের পদত্যাগ চাইছে। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির মস্ত বড় ট্র্যাজিডিও বটে।
প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি প্রমাণিত হয়নি বলে দাবি করেছেন। দুর্নীতি বলতে তিনি কি ঘুষের টাকার লেনদেন বোঝাচ্ছেন? বিশ্বব্যাংকও বলেনি যে ঘুষের টাকা লেনদেন হয়েছে। তাদের দাবি, ঘুষ চাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের কোনো ভিত্তিই নেই, তাহলে তিনি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, তাঁর সচিব ও প্রকল্প পরিচালককে সরালেন কেন? এর মাধ্যমে নিশ্চয়ই তিনি বিশ্বব্যাংক-উত্থাপিত অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, একজন মন্ত্রীকে স্বপদে (যে মন্ত্রণালয়েই তাঁকে বদলি করা হোক না কেন) বহাল রেখে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করা যায় না।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত খুব কম মন্ত্রী-আমলাই দুর্নীতির দায়ে শাস্তি ভোগ করেছেন। তাই বলে তাঁরা সৎ লোক হয়ে যাননি। সবার সততা আদালতেও প্রমাণিত হতে হয় না। বর্তমান সরকারে এমন মন্ত্রীও আছেন, যাঁর সম্পর্কে চরম শত্রুও দুর্নীতির অভিযোগ আনবেন না। আনলেও মানুষ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু তাই বলে প্রধানমন্ত্রী হলফ করে বলতে পারেন না তাঁর মন্ত্রিসভার সবাই সাধু।

২.
২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট যখন বিপুল ভোটে জয়ী হলো, তখন আওয়ামী লীগের সমর্থক তো বটেই, আওয়ামী ঘরানার বাইরেরও অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ আশান্বিত হয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, দেশ এবার জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হবে। দুর্নীতি একেবারে উচ্ছেদ না হলেও সহনীয় পর্যায়ে আসবে। স্বাধীনতার পর যাঁরা কখনোই আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেননি, তাঁরাও সে সময় আওয়ামী লীগকে মন্দের ভালো বলে মেনে নিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, মহাজোটে বামপন্থীদের অবস্থান যত দুর্বলই হোক, সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, দেশটি প্রগতির ধারায়ই চলবে। এরপর শেখ হাসিনা যখন পুরোনোদের বাদ দিয়ে নবীনদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন, তখনো তাঁদের মনে এই বিশ্বাস ছিল যে অভিজ্ঞতায় এঁরা কমতি হলেও সততা ও আন্তরিকতায় উতরে যাবেন। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই দেশবাসী হোঁচট খেতে শুরু করে। আওয়ামী লীগ অতি দ্রুত মিত্রদের দূরে ঠেলে দেওয়ার নীতি নেয়। দল ও জোটের মধ্যে যাঁরা এক-আধটু বাম চিন্তা করতেন, তাঁদের নানাভাবে অপদস্থ করতে থাকে। আওয়ামী লীগ-নেতৃত্ব ধরেই নিয়েছেন, যতই গালমন্দ করা হোক না কেন, তাঁদের যাওয়ার জায়গা নেই। কেননা, আওয়ামী লীগের বিকল্প হলো বিএনপি এবং তার ছায়াসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। প্রগতিশীল চিন্তার কোনো মানুষ তাদের সমর্থন করতে পারে না। গত সাড়ে তিন বছরে দলটি মুখে জনকল্যাণ ও প্রগতিশীলতার বুলি আওড়ালেও কাজে তার প্রমাণ দিতে পারেনি। ক্ষমতায় এসে বিএনপির মতো আওয়ামী লীগও অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় দিয়েছে। এমনকি দুই দলের মধ্যে চরম বৈরিতা সত্ত্বেও দুই দলের সমর্থক অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর আঁতাত লক্ষ করা গেছে। সর্বশেষ পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার নামে তারা এমন এক সোনার পাথরবাটি তৈরি করেছে, যাতে রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। তাহলে নূর হোসেন-তাজুলদের রক্তদান কি বৃথা গেল!
২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ দিনবদলের স্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় এল, তখন মানুষ আশা করেছিল, এবার আওয়ামী লীগ কিছুটা হলেও বদলাবে। সেই ধারণার অন্যতম কারণ ছিল, নির্বাচনে বিতর্কিত কোনো নেতাকে মনোনয়ন না দেওয়া, বিশেষ করে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে যাঁরা দলের মুখে চুনকালি মেখে দিয়েছিলেন, সেই হামবড়া নেতাদের মনোনয়ন না দিয়ে শেখ হাসিনা দলের বাইরেও প্রশংসিত হয়েছিলেন। এখন আবার তাঁদের কেউ কেউ নাকি দলীয় নেতৃত্বের আশীর্বাদ পেতে শুরু করেছেন।
বিএনপির আমলে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মহোৎসবের কারণে আওয়ামী ঘরানার বাইরের অনেকেই আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছিলেন এই আশায় যে ধর্মান্ধতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে। বাংলা ভাই বা শায়খ আবদুর রহমানের দৌরাত্ম্য কমবে, যুদ্ধাপরাধীদের আস্ফাালন দেখতে হবে না।
ক্ষমতায় থাকতে বিএনপির কতিপয় সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দলটিকে প্রায় একঘরে করে তুলেছিল, বিশেষ করে জঙ্গি উত্থানের ব্যাপারে তারা গ্রহণযোগ্য কোনো যুক্তিই দাঁড় করাতে পারেনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক পশ্চিমা দেশই বিএনপিকে গণতন্ত্রের জন্য ‘বিপজ্জনক’ বলে মনে করত। ‘মধ্য ডান’ বিএনপি থেকে ‘মধ্য বাম’ আওয়ামী লীগই তাদের পছন্দের দল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের অতি আস্থাশীল নেতৃত্ব এবং শেখ হাসিনার ‘পরিচ্ছন্ন মন্ত্রিসভা’ উল্টোরথে চলে। দেশের ভেতরে ও বাইরে যারা তাদের বন্ধু-সুহূদ ছিল, তাদের অনেকেই এখন বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গত সাড়ে তিন বছরে আওয়ামী লীগ একটি কাজই সুচারুভাবে করেছে তা হলো, মিত্র-সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের খেপিয়ে তোলা এবং বিএনপির ম্রিয়মাণ ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করা। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের পৃথিবী ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।
 সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।


http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-07-07/news/271508

সোমবার, ৪ জুন, ২০১২

‘এভারেস্ট জয় কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না’—এই মর্মে রুল জারি

সম্প্রতি এভারেস্ট জয় করেছেন বাংলাদেশের দুই নারী। এই দুজনের বদলে যদি বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের যেকোনো দুই রাজনীতিবিদ এভারেস্ট জয় করতেন, কী ঘটত তখন? জানাচ্ছেন আলিম আল রাজি

সরকারি দল
এভারেস্ট জয় করায় সারা দেশে আনন্দ মিছিল করত ছাত্রলীগ। পাড়ায় পাড়ায় মিষ্টি বিতরণ করতে দেখা যেত নেতাদের। বিভিন্ন জায়গায় করা হতো সভা-সমাবেশ। সেসব সমাবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হতো। পত্রিকায় খবর আসত—এভারেস্টকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ। নিহত ৫, আহত ৫০।
এভারেস্টজয়ীকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাতেন বিরোধীদলীয় মহাসচিব। তিনি বলতেন, ‘আসলে সরকারি দল এভারেস্ট জয় করতে পেরেছে তার মূল কারণ হলো আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন এভারেস্টে ওঠার রাস্তাটি পাকা করে দিয়েছিলাম।’
ঠিক পরের দিন সংবাদ সম্মেলন করে আগে দেওয়া ধন্যবাদ ফিরিয়ে নিতেন বিরোধীদলীয় মহাসচিব। ‘আসলে প্রথম দিন বুঝিনি মূল ব্যাপারটা। আমি আরও ভেবেছিলাম বাসার ছাদকে এভারেস্ট বলা হয়। আজ আমার বুদ্ধি বেড়েছে। বুদ্ধি বাড়ার পর এখন দেখি ঘটনা অন্য রকম। এভারেস্ট উঁচু একটা জিনিস। এটার ওপরে তিনি উঠবেন কীভাবে? এত বড় মই তিনি পেলেন কোথায়? যে দেশে কোনো উন্নয়নই নেই, সে দেশে এত বড় মই তৈরি হতে পারে না। তাই এভারেস্ট জয় পুরো ফাউল একটা ব্যাপার!’ এই মর্মে বিবৃতি দিতেন তিনি।
এদিকে এভারেস্টজয়ীকে অভিনন্দন জানিয়ে বিশাল সমাবেশ করত ছাত্রলীগ। সেখানে জয়ীকে ‘এভারেস্ট মানব, এভারেস্ট মানবী’ ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করা হতো।
সঙ্গে সরকারের তরফ থেকে জানানো হতো, এই সরকারই আসলে এভারেস্টের মূল প্রতিষ্ঠাতা। এর আগে এভারেস্ট নামক কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। এই সরকার এসে এভারেস্ট তৈরি করেছে এবং জয় করেছে। এখন বিরোধী দল ষড়যন্ত্র করে এভারেস্ট ধ্বংস করতে চায়। তাদের ষড়যন্ত্র সফল হবে না।
চলমান এভারেস্ট জটিলতা নিরসনে দুই নেত্রীকে সংলাপে বসার আহ্বান জানাতেন জ্ঞানী লোকজন। ‘উক্ত সংলাপে’ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের হস্তক্ষেপও কামনা করতেন অনেকে। সংলাপে বসার ব্যাপারে শত শত শর্ত জুড়ে দিত দুই দলই।
দেশে এত পাহাড় থাকতে সরকারি দল কেন বিদেশের এভারেস্টে উঠতে গেল। এর প্রতিবাদে সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকত বিরোধী দল। সরকারকে বিদেশিদের দালাল বলে আখ্যা দিত তারা। তথাকথিত এভারেস্ট জয়ের অপরাধে এই তাঁবেদার সরকারের এখনই পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করতেন বিরোধী দলের নেতারা।
এভারেস্ট জয়ের প্রতিবাদে সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলত। গাড়ি পুড়িয়ে মানুষ মারত বিরোধী দল। অন্যদিকে পুলিশ ভাইয়েরা বিরোধীদলীয় নেতাদের মেরে তাদের হাড্ডিগুড্ডি ভেঙে দিত।
পরিশেষে সন্ধ্যাবেলা হরতাল সফল হয়েছে এবং সরকারের এভারেস্ট জয় জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে—এই মর্মে বিবৃতি দিত বিরোধী দল। জবাবে বিরোধী দলের হরতাল জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে, এটা জানাত সরকারি দল।

বিরোধী দল
তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাতেন বিরোধীদলীয় নেত্রী। তাঁর আশপাশে বসা থাকতেন ১৮ দলের নেতারা। ‘আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল সরকার। তাতে কী হয়েছে? আমার দল বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা এভারেস্টের চূড়ায় উঠে গিয়েছে। তাই আমাদের দমিয়ে রাখা যাবে না। জনগণ আমাদের সাথে আছে।’ এই মর্মে বিবৃতি দিতেন তিনি।
বিরোধী দলের অন্য নেতারা জানাতেন, তাঁদের দল ক্ষমতায় এলে ঘরে ঘরে এভারেস্ট গড়ে তোলা হবে। ‘একটি বাড়ি একটি এভারেস্ট’ প্রকল্প চালু করা হবে। তখন আর কেউ একা এভারেস্টে উঠবে না। দেশের ১৫ কোটি মানুষকে নিয়ে তাঁদের সরকার এভারেস্ট জয় করবে।
আস্তে আস্তে মুখ খুলতে শুরু করত সরকারি দল। মন্ত্রীরা বলতেন, এভারেস্ট জয় এমন কোনো জরুরি ঘটনা নয়। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এক সভায় জানাতেন, তিনি তিন বেলা খাওয়ার আগে ও পরে এভারেস্ট জয় করেন। তা ছাড়া বিদেশিদের ‘শক্ত তরল’ খাইয়ে, ফোন করে এভারেস্ট জয় করার মূল্য নেই।

আরেক কাঠি বাড়িয়ে পরের দিন বক্তৃতা দিতেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলতেন, ‘এভারেস্ট বলে কিছু নেই। এভারেস্ট বিরোধী দলের কল্পনা মাত্র। যে জিনিসের অস্তিত্বই নেই, সেই জিনিস কীভাবে জয় করা যায়? তাই বিরোধী দলের এই দাবি অত্যন্ত ফালতু।’
‘এভারেস্ট জয় কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না’—এই মর্মে রুল জারি করা হতো। তিন দিনের ভেতরে সেই রুলের জবাব দিতে বলা হতো।
সরকারের এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠত বিরোধী দল। সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণের প্রতিবাদে এভারেস্ট অভিমুখে লংমার্চ ডাকত তারা। লংমার্চে হানা দিত পুলিশ ও ছাত্রলীগ। পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলে ফেলা হতো বিরোধী দলের নেতাদের। লংমার্চ থেকে গ্রেপ্তার করে নেওয়া হতো ৩৩ জন নেতা-কর্মীকে।
বাতিল করে দেওয়া হতো এভারেস্ট জয়। গ্রেপ্তার করা হতো এভারেস্টজয়ীকে। তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হতো তাকে। পত্রিকায় খবর আসত, ‘এভারেস্ট নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন সেই এভারেস্টজয়ী।’ কী সেই চাঞ্চল্যকর তথ্য তা আর জানার সুযোগ হতো না কারও।

হীরক রাজার দেশে পুলিশের বেশে!!!

গবেষক: রাজামশায়, রাজ্যে এমন কী ঘটেছে, আসতে হলো আবার
গত সপ্তায় না এলাম, এর ভেতরেই নতুন কাভার?
নিশ্চয় ঘটেছে ভয়ানক কিছু, তা না হলে রাজা কেন চুপ
কী এমন ঘটেছে রাজ্যে, কেন এমন তাহার রূপ?
রাজা: চুপ করো গবেষক, সাধে কী আর ডেকেছি,
রাজ্যে এসব হচ্ছেটা কী, এই জন্য কি তোমাদের রেখেছি?
গবেষক: রাজামশায়, কী হয়েছে সবকিছু বলুন খুলে
বেশিক্ষণ ধরে রাখলে শেষে না আবার পেটটা যায় ফুলে!
রাজা: রাজ্যে এসব হচ্ছেটা কী, প্রকাশ্যে পুলিশের হাতে প্রহার
গবেষক: ওদের খাদ্যাভ্যাসে চেঞ্জ এসেছে, এখন এসবই তো আহার!
রাজা: রাজ্যের পুলিশ কী শুরু করছে এই সব
দুই দিন পর পর অভিযোগ,
আজ একে মারে তো কাল ওর গায়ে তোলে হাত
কে দিল তাদের এ সুযোগ?
গবেষক: রাজামশায়, হাসালেন, এটা কোনো ঘটনা!
এই রকম কত কিছুই তো রটে, নাকি রটে না?
পুলিশের কাজ পুলিশ করেছে হাত তুলেছে গায়,
এ নিয়ে টেনশন করা কি রাজার শোভা পায়?
রাজা: ছিঃ ছিঃ! আমার রাজ্যের পুলিশ এতই বোকা!
সামান্য কটা ঘটনা দিতে পারে না ধামাচাপা
এত এত ঘটনা চোখের সামনে তুলে রেখে
শেষে কিনা পচা শামুকে কাটলি দু-পা!
গবেষক: এই নিয়ে আপনি মোটেও নেবেন না পেইন,
হীরক রাজ্যে নতুন মন্ত্র—নো পেইন, অনলি গেইন!
রাজা: তা না হয় মানলাম কিন্তু এত কিছু কেন শুনি
রাজ্যে কেন চলছে এই সব নিয়ে কানাকানি!
জলদি করে বলে দাও, স্বয়ং রাজা চায় এর বিচার
আপাতত কাজ চালাতে এক-এ এক-এ মিলিয়ে দাও চার!
গবেষক: পুলিশের বিচার করবে পুলিশ!
পুলিশে পুলিশে জ্ঞাতি ভাই,
কাকের মাংস কাকে খায় না
ইহার উপর সত্য নাই!
রাজা: সত্য-মিথ্যা জানি না, একটা কিছু করো,
ভালো-খারাপ বুঝি না, আপাতত কজন ধরো!
গবেষক: পুলিশ এখন চলে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে,
রাজা: পুলিশকে কন্ট্রোল করার হিম্মত কি কারও নাই রে!
গবেষক: পুলিশ থেকে নিরাপদ দূরে থাকতে
পরামর্শ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী,
রাজা: পুলিশ কি আর মানুষ নেই!
যন্ত্র-মানব নাকি ষড়যন্ত্রী?
গবেষক: রাজামশায়, রাজ্যের যত বড় বড় পুলিশ
শুনেছি সবার নাকি রাজার এলাকায় বাড়ি,
এটা কি রাজার নতুন কোনো শখ
নাকি অন্য এলাকার পুলিশগুলো আনাড়ি!
রাজা: কে বলে এসব কথা, কোত্থেকে বয় এই বাতাস?
ভেবেছ কী, ভাত না খেয়ে হীরকের রাজা খায় শুধু ঘাস?
গবেষক: রাজামশায়, মাফ করবেন, এতটা লাগবে বুঝিনি,
আপনার সাথে থাকি তো, টক-ঝাল বুঝি না, বুঝি শুধু চিনি!
রাজা: হীরকের দেশে পুলিশের বেশে কে হাসে ওই ভয়ানক হাসি?
গবেষক: আর কে মশায়, জামাটা খুললেই তো সেই পুরোনো-বাসি!
আচ্ছা, রাজামশায় কি পড়েছেন বইটা, ফ্রাংকেনস্টাইন নাম তার
রাজা: কী আছে ওতে, হঠাৎ এ বইয়ের কেন অবতার?
গবেষক: সেখানে ছিল এক পাগলা ডাক্তার,
মানুষ মেরে বেশ নামডাক তার।
রাজা: দেখেছ, মানুষ মারলেও নাম-ডাক হয়!
গবেষক: কিন্তু সেই নাম আর কয়দিনই বা রয়!
মৃত জোড়া দিয়ে সে বানিয়েছিল এক প্রকাণ্ড দানব
ভেবেছিল ওটা কথা শুনবে, হায়রে বোকা মানব!
রাজা: কী? কথা শোনেনি, এত বড় স্পর্ধা ওই সামান্য দানবের!
গবেষক: জি, নিজের তৈরি দানবই জান নিয়েছিল মনিবের!
রাজা: এতক্ষণে বুঝলাম, কিছু একটার ইঙ্গিত আছে তোমার কথায়,
ঝটপট বলে ফেলো, দেখি লুকিয়ে রেখেছ কোথায়?
গবেষক: রাজা দেখি আজকাল ইঙ্গিতও বোঝেন
আর কদিন পর তো হয়ে উঠবেন আইনস্টাইন,
শুধু এটা বোঝেন না, এই পোষা পুলিশগুলো
একদিন হয়ে উঠতে পারে ফ্রাংকেনস্টাইন!
রাজা: হীরকের রাজ্যে দানব আসবে?
রাজার চেয়ে বড় দানব আছে নাকি তল্লাটে!
কি, ঠিক কি না?
গবেষক: ঠিক ঠিক
এলে আসুক, আমরাও গুনে দেখব
কত বড় মাইক আছে কার কল্লাতে!
রাজা: শাট আপ, চুপ করো, ব্যাটা গবেষক
ভয় করছে, দরজায় কে যেন করল নক!
গবেষক: ছিঃ ছিঃ! রাজামশায়, ভয় পেলে কি চলবে?
হীরকের রাজা ভয় পেলে লোকে কী বলবে!
রাজা: লোকের কথার খেতা পুড়ি, আছে তো বেশ সুখে
জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে পুরব সবাই মুখে!
গবেষক: রাজা কিন্তু ভুল করছেন, জনগণের কথা ভাবুন
পুলিশের হাতে তুলে দেবেন না সব ক্ষমতা
যার যা প্রাপ্য ততটুকুই দিন তাকে
একবার স্বাদ পেলে কেউ ছাড়তে পারে না এর মমতা!
রাজা: বাদ দাও ওসব ফোরকাস্টিং শক
আমি আজ যাই গবেষক, মাথাটা করছে ঝিমঝিম!
গবেষক: আপনি রেস্ট নেন, পুলিশের বিষয়টা দেখছি,
দেখি ব্যাটারা কত দূর যায়, আর কী কী করে ঘোড়ার ডিম!
তবে পুলিশের এই নির্যাতনের কথা আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত!
ওরা আসলেই আর মানুষ নেই, মস্তিষ্কবিকৃত!


http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-06-04/news/262989

শুক্রবার, ১১ মে, ২০১২

সরকারের তাহলে ভয় কিসের!!!

ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়, কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে নয়। তিনি বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়াকে ভারত সফরেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রণবের প্রথম বাংলাদেশ সফরকালে যে শীতল মনোভাব বিএনপির প্রতি দেখানো হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে এসব পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রণব, হিলারি এবং সবশেষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে দুটো বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। এক. রাজনৈতিক সমঝোতা এবং দুই. সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। দুটো বিষয়ের মূল লক্ষ্য অভিন্ন: তা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান। বাংলাদেশে এখন যত রকম রাজনৈতিক হানাহানি হচ্ছে, তার মূলেও রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখা না-রাখা নিয়ে বিরোধ।
অশক্ত গণতন্ত্রের একটি দেশ হিসেবে এই বিরোধ অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের দেশে শাসকগোষ্ঠী ‘অলটেরোকেসি’ বা ক্ষমতার পরিবর্তনে বিশ্বাস করে না। নির্বাচনে কারচুপি যতভাবে করা সম্ভব, তার মাধ্যমে জনগণের রায়কে ছিনতাই করার চেষ্টা এসব দেশে থাকে। বাংলাদেশে এটি চরম পর্যায়ে চলে গিয়েছিল বলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব অরাজনৈতিক কিছু নাগরিকের কাছে প্রদান করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সমঝোতাকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা সম্ভবত সফল হবে না। আন্তর্জাতিক মহলও সে রকম ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত।

২.
গণতন্ত্র মানে যদি হয় জনগণের ম্যান্ডেট, সে ম্যান্ডেট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে এখনো রয়েছে। জাতীয় পার্টি ছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দল এই সরকারব্যবস্থার পক্ষে ছিল। জাতীয় পার্টির নেতারা ১৯৯১ সালে অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে সংগত কারণে এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। সেই দলের নেতা এরশাদ পর্যন্ত জনগণ চাচ্ছে বলে তাঁর দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারে রাজি আছে বলেছেন সাম্প্রতিক কালে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দেশে এত সংঘাত হওয়ারও কথা ছিল না। সরকারে থাকা অবস্থায় ২০১০ সালে সংসদীয় কমিটির সঙ্গে সংলাপে স্বয়ং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংস্কার সাপেক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মতামত জানিয়েছে। শেখ হাসিনা নিজে ১৯৯১ সালের নির্দলীয় সরকার, পরের দুটো তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ২০০৭ সালের ‘অস্বাভাবিক’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর এই অবস্থানে পরে বিচ্যুতি না ঘটলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে দেশে কোনো সংঘাত সৃষ্টির কারণ হয়তো থাকত না।
প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে এখন রাজি নয়? এর সহজ উত্তর হতে পারে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার প্রবল ভীতি। বিদেশি ‘বন্ধুরা’ সামনের সময়ে হয়তো আরও স্পষ্ট করে বলবেন, দেশে এখনি ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস, ড. আবেদের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি থেকে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ (প্রথম আলোর ৯ মের জরিপ অনুসারে ৯০ দশমিক ১৯ শতাংশ) বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে। সুপ্রিম কোর্টের যে আদেশের খণ্ডিত ও একপেশে প্রয়োগ করে সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপকে যৌক্তিক করতে চায়, সেখানেও জনগণ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে আগামী দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত করার নির্দেশনা দেওয়া আছে। আওয়ামী লীগ তবু রাজি নয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারে। সর্বশেষ যা খবর, এ নিয়ে এমনকি কোনো সংলাপে বসতেও রাজি নয় দলটি।
সরকারি দলের কেন এই অনড় অবস্থান? একটি সফল সরকারের তো সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি ভীতি থাকার কথা নয়। আমরা পত্রিকায় দেখি, সরকারের মন্ত্রীরা সবাই নিজেকে সফল ভাবেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেন, চালচলনে সবাই স্যুটেড-বুটেড না হলেও তাঁর সব মন্ত্রীই সফল। আজকের পত্রিকায় দেখি, দেশে এমন এক গুম আতঙ্কে গুমোট সময়ে সাহারা খাতুন বললেন: তিনি অবশ্যই সফল!
আবারও বলি, এত সফল একটি সরকারের তো নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভয় পাওয়ার কথা নয়! তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এর আগে মহাব্যর্থ কিছু সরকার অংশ নিয়েছিল। তারা প্রত্যেকেই পরাজিত হয়েছিল। গত বিএনপি সরকারের ভরাডুবিই ঘটেছিল ২০০৮ এর নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ কি নিজেদের ব্যর্থতার কারণে এমন পরিণতির আশঙ্কা করছে? একমাত্র এই আশঙ্কা থাকলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে তাদের প্রবল বিরোধিতা আমাদের কাছে বোধগম্য হতো।
কিন্তু আমরা প্রকাশ্যে তাদের কোনো ব্যর্থতা স্বীকার করতে দেখি না। এ জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের মনস্তত্ত্ব আরও দুর্বোধ্য হয়ে পড়ছে।

৩.
প্রকাশ্যে আমরা আওয়ামী লীগকে বলতে শুনি শুধু তাদের সফলতার কথা। এর কারণ হতে পারে এই যে, সাধারণ মানুষ যেভাবে সফলতার মানে বোঝে, তার চেয়ে সরকারি দলগুলোর বোঝাটার ভঙ্গিটি ভিন্ন ধরনের। যেমন: আমরা যখন ইলিয়াসের গুম হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছি, সরকারের লোকজন হয়তো ভাবছেন ড. কিবরিয়া বা আহসানউল্লাহ মাস্টারের হত্যাকাণ্ডের তুলনায় এটি তেমন কোনো বিষয় নয়। আমরা যখন ড. ইউনূসের অপমানে দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে ভাবি, তাঁরা হয়তো ভাবেন প্রধানমন্ত্রীর শান্তির মডেল উত্থাপন বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে নতুন উচ্চতায়! আমরা যখন নদী শুকিয়ে যাচ্ছে বলে হাহাকার করে উঠি, তাঁরা হয়তো ভাবেন সমুদ্রজয়ের পানি দিয়ে সমাধান হয়ে যাবে সব সমস্যার। আমরা যখন কর্মসংস্থান বা বিনিয়োগ-পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, তাঁরা তখন শুধু জিডিপির গতি দেখেই তৃপ্ত থাকেন।
আমাদের চেয়ে তাঁদের দেখার চোখ ভিন্ন। দলীয়করণকে তাঁরা হয়তো ভাবেন ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের’ লোকের মূল্যায়ন, দুর্নীতিকে ভাবেন দেশসেবার কারণে অর্জিত অধিকার বা ধনতন্ত্রের জন্য মূলধন পুঞ্জীভূতকরণ, রাজনৈতিক সন্ত্রাসকে ভাবেন মহৎ প্রতিশোধ, শেয়ারবাজার লুট করাকে ভাবেন চতুর মানুষের অর্জন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি মানে ভাবেন বাজার অর্থনীতি!
সরকারি দল নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো করে শুধু নির্বাচনে জেতার জন্য, আমরা ভুল করে ভাবি তা বাস্তবায়নের জন্য। সরকারি দল দিনবদল মানে ভাবে শাসকগোষ্ঠী আর তার অনুগতদের দিনবদল, আমরা ভাবি সবার জন্য দিনবদল। সরকার ভাবে দেশটা সরকারি দলের, আমরা ভাবি জনগণের। সরকার ভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মানে ভারত, আমরা ভাবি অন্যরাও।
বোঝার ক্ষেত্রে এই মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য সত্যি না হলে সরকার আর আমাদের মূল্যায়ন এত ভিন্ন হওয়ার কারণ নেই। আমার কথা হচ্ছে, সরকারের আত্মমূল্যায়ন সঠিক হলে সুষ্ঠু আর অবাধ নির্বাচনে তাদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই। আর এমন নির্বাচন কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হওয়া সম্ভব।

৪.
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি অনীহার একটি কারণ আমরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের মুখে শুনি। তাঁরা ১/১১ পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গ টেনে সে সময় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের প্রতি নিপীড়নের কথা বলেন। এই অভিযোগ অমূলক নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে সংবিধান-বহির্ভূতভাবে বহুদিন ক্ষমতায় ছিল, এটিও সত্যি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিকভাবে সৃষ্ট একটি সরকার। এ ধরনের পরিস্থিতির মূল কারণ ছিল বিএনপি কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মোড়কে একটি অনুগত নির্বাচন প্রশাসন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থাপনের চেষ্টা। সেই চেষ্টা সহিংসভাবে ঠেকাতে গিয়েছিল তৎকালীন বিরোধী দল, এর পরিণতিতে সৃষ্ট অস্বাভাবিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সদলবলে অভিনন্দিত করেছিলেন দলটির সভানেত্রী। একইভাবে বর্তমান সরকারি দলও কারসাজির নির্বাচন করতে গেলে তা যেকোনো মূল্যে বর্তমান বিরোধী দল প্রতিহত করার চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক।
এই অনিবার্য সংঘাত এড়ানোর একমাত্র সমাধান হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন (এবং ২০০৬ সালের মতো তা টেম্পারিং করার চেষ্টা না করা)। এ জন্য দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। কিন্তু আমার মতে, সরকার নিজে থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে সংলাপেরও তেমন প্রয়োজন নেই। এই উদ্যোগের ভিত্তিতে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে ত্রুটিগুলো রয়েছে (যেমন: এর গঠন, কার্যকাল এবং ক্ষমতাসংক্রান্ত), তা দূর করে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব নয়।
এ জন্য অতিকেন্দ্রীভূত বর্তমান সরকারব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারপ্রধানের সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছার অভাব ছিল বলে অতীতে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কোনো নজির আমরা পাইনি। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কিছু সফল সংলাপ হয়েছিল। কিন্তু ৯০-পরবর্তী গণতন্ত্র পুনরুত্থানের যুগে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের নজির সম্ভবত আর নেই। বর্তমান সরকারের আমলে সংবিধান সংশোধনী সংক্রান্ত সংলাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তাসহ বহু বিষয়ে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সরকার সেই মতৈক্যের গুরুত্ব অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রদান করেনি। এটি প্রমাণ করে, সরকারপ্রধান না চাইলে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে প্রকৃত সমাধানের সম্ভাবনা তেমন নেই বাংলাদেশে।
আমরা সেই সদিচ্ছার প্রত্যাশা করি। দলীয় সরকারের মাধ্যমে একতরফা নির্বাচন বাংলাদেশে অতীতে হয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এমন নির্বাচনগুলো হয়েছে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় থেকে। আগামী নির্বাচনও এভাবে করার উদ্যোগ নিলে মানুষ সেই ভয়ের গন্ধ পাবে। আমার মনে হয় না, জনগণকে ভয় পেয়ে বা ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়।
জনগণের সঙ্গে এমন ভয়ের সম্পর্ক যদি না থাকে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা অনুসারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনে সরকারের রাজি হওয়া উচিত। সেটি যত তাড়াতাড়ি হবে, ততই মঙ্গলজনক।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-05-11/news/256731

রবিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১২

20 essential PC shortcuts

  • Copy a selected item: Ctrl+C
  • Cut a selected item: Ctrl+X
  • Paste a selected item: Ctrl+V
  • Undo an action: Ctrl+Z
  • Redo that thing I just undid: Ctrl+Y
  • Select everything: Ctrl+A
  • Print: Ctrl+P 
    • Switch between open windows
    Alt+Tab 
    •  Clear away everything and show the desktop
    Windows logo key Picture of the Windows logo key+D 
    •  Minimize the window
    Windows logo key Picture of the Windows logo key+Down Arrow
    •   Maximize the window
    Windows logo key Picture of the Windows logo key+Up Arrow
    •  Compare and contrast in a snap
    Windows logo key Picture of the Windows logo key+Left Arrow or Right Arrow
    •  Multitask with multiple monitors
    Windows logo key Picture of the Windows logo key+Shift+Right Arrow or Left Arrow
    •  Open Task Manager
    Ctrl+Shift+Esc
    •  Choose a presentation display mode
      Windows logo key Picture of the Windows logo key+P
    •  Zoom in, zoom out
    Windows logo key Picture of the Windows logo key+Plus Sign or Minus Sign
  •  Search for files and folders
    Windows logo key Picture of the Windows logo key+F
    •  Open a new instance of a program
      Windows logo key Picture of the Windows logo key+Shift+Click a taskbar icon
    •  And when you need it...get help
      Windows logo key Picture of the Windows logo key+F1