Powered By Blogger

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

খালেদাকে নিয়ে বক্তব্যে বিরোধী দলের ‘ছিঃ ছিঃ’

‘খালেদা জিয়ার মা লক্ষ্মী রানী মারমা দার্জিলিংয়ের চা-বাগানের মালিক উইলসনের চাকরানি ছিলেন। চা বাগানের মালিকের ছিল মদ ও নারীর প্রতি আসক্তি। লক্ষ্মী রানী গর্ভবতী হলে উইলসনের দারোয়ান মুরালী মোহন মারমার সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয়। উইলসনের তত্ত্বাবধানে ১৯৪৫ সালের ১৩ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্ম হয়। খালেদা জিয়া ইহুদি ঔরসজাত। তাঁর গয়ের রং ও খাদ্যাভ্যাস তার প্রকৃত ইহুদি পিতার সঙ্গে মিল আছে। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমান ফুর্তি করতে এসে ফেঁসে গিয়ে খালেদা জিয়াকে বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তা জানজুয়ার সঙ্গে পরকীয়ায় মত্ত ছিলেন। লোকে বলে জানজুয়ার অবিকল চেহারা পেয়েছে কোকো।’
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সাংসদ অপু উকিল পাকিস্তানের সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের ‘ইন্দো-পাকিস্তান ওয়ার অব ১৯৬৫’ বই থেকে উদ্ধৃত করে বক্তব্য দেন। অপু উকিল বক্তব্য দেওয়ার সময় সিদ্দিক সালিকের লাল মলাটের বইটি উঁচিয়ে সংসদে প্রদর্শন করেন।
অপু উকিলের এই বক্তব্যের সময় বিএনপি ও জামায়াতের সাংসদরা তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং সমস্বরে ছিঃ ছিঃ ধ্বনি দেন। বিএনপির সাংসদেরা অপু উকিলের মাইক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে দাবি জানান। অপু উকিল বক্তব্য অব্যাহত রাখলে রাত আটটা ৫৭ মিনিটে বিএনপি-জামায়াতের সাংসদেরা জমিরউদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে ওয়াকআউট করেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন। অপু উকিলের বক্তব্যের সময় সরকারি দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে উত্সাহ দেন। এ সময় সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশন কক্ষে ছিলেন না। 
এর আগে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হলে তা মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই চলে। কিন্তু রাত আটটার পর বিরোধীদলীয় সাংসদ নিলোফার চৌধুরী মনি ও সরকারদলীয় সাংসদ অপু উকিলের বক্তব্যে হঠাত্ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ।

সোমবার, ২০ মে, ২০১৩

ঢাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’

বিরোধী দলকে আপাতত আর রাজপথে দাঁড়াতে দেবে না সরকার। আগামী এক মাস কোনো সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল রোববার এ ঘোষণা দিলেও কার্যত ৫ মে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির পর রাজধানীতে আর কোনো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করতে দেয়নি সরকার। এমনকি মানববন্ধনের মতো কর্মসূচির ওপরও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা চলছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় মানববন্ধন কর্মসূচি আর করতে দিচ্ছে না পুলিশ।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকার দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিল করা সরকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান বলেন, সরকার সংবিধানবিরোধী ও স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না। 
সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত জরুরি অবস্থার শামিল বলে মনে করেন প্রবীণ আইনজীবী রফিক-উল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘তবে আমি মনে করি, সরকার জরুরি অবস্থা জারি করার মতো কোনো বোকামি করবে না।’
সভা-সমাবেশ বন্ধ করে দেওয়া প্রসঙ্গে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গতকালই দুই রকম ব্যাখ্যা এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সকালে বলেছেন, যেসব দল অনুমতি নিয়ে সমাবেশ দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেয় এবং জনসাধারণের ওপর অন্যায়-অত্যাচার ও জ্বালাও-পোড়াও করে, তাদের আগামী এক মাস সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। পরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ নিষেধাজ্ঞা শুধু রাজধানী ঢাকার জন্য এবং এটা সব দলের ওপর কার্যকর হবে।
আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে এক মাস সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 
তবে এ দুটি যুক্তিকেই খারিজ করে দিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী রফিক-উল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কেউ নাশকতা চালাচ্ছে বা কোথাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো—এ অজুহাতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা উচিত হবে না। কেউ জ্বালাও-পোড়াও বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালালে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। আর অতীতে এর চেয়েও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে। কখনো সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়নি।
সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘জনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’
১৩ মে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট। ওই দিন অনুমতি না পেয়ে তা পিছিয়ে ১৫ মে করা হয়। পরিবর্তিত তারিখেও অনুমতি না পেয়ে ওই দিন সকালে সংবাদ সম্মেলন করে ১৯ মে দেশব্যাপী হরতাল ডাকে ১৮ দল। পরে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সে হরতাল প্রত্যাহার করে নেয়।
পুলিশ অনুমতি বাতিল করায় গত ১৭ মে মৎস্য ভবন চত্বরে তরিকত ফেডারেশনের মহাসমাবেশ কর্মসূচি কর্মসূচি স্থগিত করে। সর্বশেষ বামপন্থী চারটি দল—জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ ও জাতীয় গণফ্রন্টকে গত শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করতে দেয়নি পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির কর্মসূচি বন্ধ করার কৌশল হিসেবে সরকার সব দলের সভা-সমাবেশের ওপর এক মাসের এ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কারণ এক মাস পার হলে, এর কিছুদিন পর শুরু হবে রমজান মাস। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের আগ পর্যন্ত বিএনপির পক্ষে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। 
৯ আগস্ট ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ। আর ২৮ অক্টোবর থেকে আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে বড় আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মধ্য আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন
প্রথম আলোর মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল মিরসরাই উপজেলার দ্বিতীয় থানা হিসেবে বারইয়ারহাটের জোরারগঞ্জ থানা উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে সভা-সমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। বৃহত্তর রাজনৈতিক দল হিসেবে আরও বেশি আছে বিএনপির। কিন্তু তাদের সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না। এমনকি তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনেও সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না। এর কারণ কী?’ জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা সমাবেশের অনুমতি নিয়ে সমাবেশকে দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেন, জনসাধারণের ওপর অত্যাচার করেন, নির্যাতন করেন, গাড়ি পোড়ান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্র নষ্ট করেন, দোকান লুট করেন, তাঁদের যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে আমরা সমাবেশ করার অধিকার স্বীকার করা সত্ত্বেও আগামী এক মাস পর্যন্ত কোনো সমাবেশ কোনো দলকেই করতে দেব না।’
মন্ত্রীর বক্তব্যের স্পষ্টীকরণ 
গতকাল রাত ১১টায় ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের স্পষ্টীকরণ’ শিরোনামে সরকারি তথ্য বিবরণী দিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, ‘আজ মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানা উদ্বোধনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের স্পষ্টীকরণের লক্ষ্যে জানানো যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যদি কোনো রাজনৈতিক দল এমন কোনো কর্মসূচি দেয় যাতে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা নাশকতার আশঙ্কা থাকে বা সেরূপ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার স্বার্থে সেসব দলের সভা-সমাবেশের কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেবে না সরকার।’ তথ্য বিবরণীতে আরও বলা হয়, ‘সাধারণ সমাবেশ করার ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই। এটা কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং জনগণের জানমাল রক্ষার্থে পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই।’ 
বিভিন্ন দলের নিন্দা
আগামী এক মাস সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। গতকাল রোববার পৃথক বিবৃতিতে দলগুলো সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী’ আচরণ বলে মন্তব্য করেছে।
গতকাল গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে মিছিল-সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করতে ২৮ মে সচিবালয় ঘেরাও ও ২৩ মে মিরপুরে সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
গণসংহতি আন্দোলনের এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, সরকার তার অপশাসন-দুর্নীতি-লুটপাট ঢাকতে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন কর্মসূচি চাপা দিতে সভা-সমাবেশের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ ছাড়া সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ ছাত্রশক্তি।


http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-05-20/news/353602

শনিবার, ১১ মে, ২০১৩

তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় ৯০% মানুষ !!!



আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সম্পন্ন করার ব্যাপারে দেশের মানুষ প্রায় একযোগে মত দিয়েছে।

প্রথম আলোর উদ্যোগে পেশাদার জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থা ওআরজি-কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, আগের বছরগুলোর তুলনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে জনমত এখন আরও জোরালো। বেশির ভাগ মানুষ মনে করছেন, দেশের পরিস্থিতি হতাশাব্যঞ্জক। দেশের সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে মানুষের মতামত যাচাইয়ের জন্য গত ৯ থেকে ২০ এপ্রিলের মধ্যে এ জরিপ পরিচালনা করা হয়।
অধিকাংশ মানুষ এ কথা মনে করছেন যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় রায় ঘোষণার পর পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিপক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মত পাওয়া গেছে।
নির্বাচনকালীন সরকার, দেশের চলমান পরিস্থিতি ও এই প্রেক্ষাপটে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ, জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেনা হস্তক্ষেপের শঙ্কা এবং বিতর্কিত বিভিন্ন দলের সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জোটবদ্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে এই জরিপে মানুষ তাদের মতামত জানিয়েছেন। এসব মতামতে দেশের এক সংশয়পূর্ণ ছবি ফুটে উঠেছে।
জরিপটি পরিচালিত হয় দেশের প্রতিটি প্রশাসনিক বিভাগের ৩০টি জেলা শহর ও গ্রামের তিন হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর। বাংলাদেশের জনবিন্যাস অনুযায়ী উত্তরদাতাদের অনুপাত প্রতিনিধিত্বশীল রাখা হয়।
বিশ্বের বহু প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম ও জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতিতে জনমত যাচাই করে থাকে। ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর অপিনিয়ন অ্যান্ড মার্কেট রিসার্চের (ইসোমার) আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নৈতিক মানদণ্ড অক্ষুণ্ন রেখে জরিপটি করা হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নির্দলীয় অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন চায়। এই দাবির পক্ষে মানুষের সংখ্যা এখন ৯০ শতাংশ। ২০১১ ও ২০১২ সালের জনমত জরিপেও মানুষের এ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আগের জরিপের প্রায় অর্ধবছরের ব্যবধানে এর পক্ষে যথেষ্ট হারে জনমত বেড়েছে।
বেশির ভাগ মানুষ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অর্ধেক মানুষ বলেছে, দেশ অত্যন্ত খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাকি অর্ধেকের মধ্যেও ৩৫ শতাংশ মানুষের ধারণা, দেশ খারাপ অবস্থা পার করছে। এতে করে দেখা যায়, মোট ৮৫ শতাংশ মানুষ দেশের অবস্থা খারাপ বলে মনে করছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যে সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি, এও তাদের হতাশার অন্যতম কারণ।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তির সময় পরিচালিত জরিপে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এই প্রত্যাশা ছিল যে, ভবিষ্যতে হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতায় ভরা নৈরাজ্যকর অবস্থা আর ফিরে আসবে না। পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের এ আশাবাদে ক্রমাগত ভাঙন ধরেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে কাদের মোল্লা ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর সারা দেশে যে তীব্র হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে, ৭৯ শতাংশ মানুষ মনে করে, সরকার তা সামলাতে পারেনি। খুব কমসংখ্যক মানুষই বলেছে যে সরকার সুষ্ঠুভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের জরিপে বিপুল সংখ্যায় মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি করে এবং মহাজোট সরকার এ বিচারের কাজ সম্পন্ন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা জানায়।
এবারের জনমত জরিপে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে মত দিয়েছে।(64.8%)
শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা। পক্ষান্তরে এর বিপক্ষে মত দিয়েছে অর্ধেকের সামান্য কিছু বেশি মানুষ। জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন মানুষ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন সম্পর্কে জানে না।
শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে তাদের আন্দোলন শুরু করে। পরে প্রধান বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী তাদের নিয়ে সমালোচনামুখর হয়ে উঠলে এবং তাদের সম্পর্কে নানা অপপ্রচার চললে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়।
বেশির ভাগ মানুষ বিতর্কিত দলের সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্রব ও সম্পর্ক অপছন্দ করে। অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির এবং বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোটবদ্ধ থাকার বিপক্ষে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে পক্ষে-বিপক্ষে মানুষের মতামত প্রায় কাছাকাছি। তবে এর মধ্যেও কিছু বেশি সংখ্যক মানুষ মনে করে তেমন কোন আশঙ্কা নেই। বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে—প্রায় প্রতি চারজনের একজন—বলেছে যে, এ ব্যাপারে তারা কিছু বলতে চায় না বা কিছু জানে না।

http://www.prothom-alo.com/imagefiles/Opinion_Poll_April_2013.pdf

শুক্রবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

পদ্মায় মান ডুবলেও আশা ডোবেনি


বিশ্বব্যাংক সরকারকে যে ‘বাঁশ’ দিয়েছে, তা দিয়ে সেতু না হোক, সাঁকো নির্মাণের চেষ্টা করে দেখতে পারে সরকার। পরিহাস হলো, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামও সাকো ইন্টারন্যাশনাল। হিন্দু ঐতিহ্যে কেউ মারা গেলে তাঁর নামের ওপরে চন্দ্রবিন্দু যোগ করার একটা রীতি ছিল। সেই অর্থে সাকো ইন্টারন্যাশনালকে আমরা ‘সাঁকো ইন্টারন্যাশনালও’ ডাকতে পারি। সাকো নতুন করে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংকে ‘ইন্টারন্যাশনাল’ করেছে। এই কাণ্ডকারখানায় জিতল বিশ্বব্যাংক ও সাকো, হারল বাংলাদেশ। 
পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের দেশীয় প্রতিপক্ষ কে? এক কথার উত্তর, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সাহেব স্বয়ং। তাঁর পেছনে কোন কোন ব্যক্তি আছেন, আমরা জানি না। তবে দেখা যাচ্ছে, আবুল হোসেন এবং গংয়ের গোলানো কালিমা সরকার নিজের গায়ে মেখে গর্ব করছে যে, আমরা বিশ্বব্যাংককে ‘না’ করে দিয়েছি! অপমানে যিনি হাসতে পারেন, তিনি মহান। কিন্তু আমাদের মনে পড়ছে এই কথাটা, সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি? 
হাসির প্রশ্নটা আসছে, কারণ বিশ্বব্যাংক প্রথমে চুক্তি বাতিল করেছে, তারপর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে পাবলিক স্তরে প্রচার করেছে, নিজস্ব তদন্ত দল পাঠিয়ে হম্বিতম্বি করেছে। এর সবকিছুতেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে, দেশ হিসেবে হেয় হলেও সরকারের গর্বের কমতি হয়নি। বরং অর্থমন্ত্রীর অক্ষয় হাসিমুখ দেখে আমাদেরও হাসি পেয়েছে। 
সর্বশেষ আবুল হোসেনকে মামলার বাইরে রেখে বিশ্বব্যাংককে সরে দাঁড়ানোর বৈধতা জুগিয়েছে দুদক। যদি দুর্নীতি হয়েছে বলে স্বীকার করি, তাহলে গোড়াতেই ব্যবস্থা নিলে এত বিপর্যয় হতো না। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে তাজরীনের মালিক দেলওয়ার হোসেনের সাফাই গাইছেন, তখন সরকারের অনেক কর্তাব্যক্তি আবুল হোসেনের সাফাই গাইতে কসুর করেননি, বিব্রত বোধ করেননি। সচিব দুর্নীতি করেছেন অথচ মন্ত্রী জানেনই না, তা শিশুও বিশ্বাস করবে না। এতভাবে সেতু প্রকল্পকে অনিশ্চিত করার পর, নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার পর এখন বিশ্বব্যাংককে ‘না’ বলায় কিছু রক্ষা হয় না। বরং এই ‘না’ দুর্নীতির পরোক্ষ স্বীকারোক্তিই হয়ে দাঁড়াল। কারণ সরকার বলতে পারছে না, দুর্নীতি হয়নি। বলতে পারছে না, আবুল হোসেন নির্দোষ। বলতে পারছে না, বিশ্বব্যাংক এখতিয়ারের বাইরে ক্ষমতাচর্চা করেছে। পারছে না নিজের দোষে। এই দোষের দোষী বাংলাদেশের জনগণ হতে রাজি হবে না। সরকার এখানে জাতীয় স্বার্থ দেখার বদলে ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর স্বার্থকেই বড় করে দেখেছে। এটা ঢাকতে গোপনে আপস করার চেষ্টা করেছে, আর জনসভায় করেছে বড়াই। কারণ যা-ই হোক, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত একজনকে বাঁচাতে সরকার এখানে দেশের ভাবমূর্তি জলাঞ্জলি দিল। অন্যদিকে, বিএনপি জোটের আচরণ ছিল পোড়া গুদামের আলুতে লবণ লাগিয়ে খাওয়ার মতো। সরকারের অপদস্থতায় তারা খুশি হয়েছে, দেশের ক্ষতির কথা চিন্তাই করেনি। 
এভাবে দুর্নীতির পাঁয়তারার অভিযোগে পুরো প্রকল্পই বাতিল করে দেওয়ার নজির বিশ্বে বিরল। ভারতে বিশ্বব্যাংকের ঋণে এইডস পরীক্ষার যন্ত্র কেনায় বিরাট দুর্নীতি হলেও প্রকল্প বাতিল হয়নি। প্রকল্পও চলছে, দুর্নীতির তদন্তও চলছে। বিশ্বব্যাংক এমন বৈরিতা চীন বা মালয়েশিয়ার সঙ্গে করার সাহস করত না। কারণ, সেসব দেশের সরকারের কোমরের জোর আর আত্মসম্মান অনেক বেশি। এ রকম আনাড়িপনা কোনো কাজেরই না। এমন না যে ভারত বা চীনে দুর্নীতি একেবারে কম। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক এমনটা করতে পেরেছে, সরকারের অদক্ষতা, বালখিল্য ও দুর্নীতিবাজদের ঢাল হওয়ার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের অন্য কোনো রাজনৈতিক অভিপ্রায়ও থাকা অসম্ভব নয়। ড. ইউনূসের সঙ্গে সরকারের আচরণও এই বৈরিতায় ইন্ধন জুগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এসব কথা আজ কে শুনবে?
বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের তরফে যখন বারবার বলা হচ্ছিল, যমুনা সেতু বানাতে পারলে পদ্মা সেতুও নিজস্ব অর্থায়নে বানানো সম্ভব। পাঁচ বছরে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, বছরওয়ারি হিসেবে তা বহনের সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে। বৈদেশিক রিজার্ভ, রেমিট্যান্স-প্রবাহ ইত্যাদি সেই আশাবাদের ভিত্তি হতে পারত। প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ করে দিলেও কাজ হতো। উপায়ের অভাব ছিল না, অভাব ছিল পরিকল্পনার আর ব্যবস্থাপনার সামর্থ্যের। অথচ কিনা সরকার দলীয়ভাবে চাঁদা সংগ্রহের ঘোষণা দিল। সেই চাঁদা আদায় নিয়ে রাজশাহীতে ছাত্রলীগের দুই পক্ষ মারামারিও বাধাল। এমন সব হাস্যকর কর্মকাণ্ড কেবল ছাত্রলীগই দেখায়নি, সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বও দিনের পর দিন দেখিয়ে গেছে। এসবের কোনো প্রয়োজন ছিল না। 
বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনেক পুরোনো। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টিগলিজসহ অন্যরা সেসব দুর্নীতির বিষয়ে বই ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশেও গত বিএনপি সরকারের আমলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে হাটিকুমরুল সড়ক নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোয় বিশ্বব্যাংক বহু অপকর্ম করে থাকে। এসবের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ বিশ্বব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের বেলায় ঘটল উল্টোটা। বিশ্বব্যাংকেরই ঠেকা ছিল বাংলাদেশের মতো দেশকে ঋণ দেওয়ার। এটাই তাদের ব্যবসা। কিন্তু এখন আমরাই ঠেকে গেলাম।
দুর্নীতি সমস্যা। কিন্তু আরও বড় সমস্যা দুর্নীতিকে জায়েজ করানোর রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আয়োজন। যে বাংলাদেশ ‘তলাহীন ঝুড়ি’ বদনাম ঘুচিয়ে প্রবৃদ্ধি সাতের ঘরে নেওয়ার মুখে। যে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সামাজিক সেবাসূচকে ভারতের থেকে এগিয়ে, সবচেয়ে উন্নয়নশীল ২০টি দেশের তালিকায় ওপরের দিকে, সেই বাংলাদেশ কেবল রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও অপরিণামদর্শিতার জন্য এ রকম হেনস্তা হতে পারে না। 
ওপরে বলা সাফল্যের শিরোপাগুলি কিন্তু বিশ্বব্যাংকেরই দেওয়া। তাহলে তারাই কেনবা আবার বাংলাদেশকে এমন ব্যর্থ করে দেওয়ায় ব্যতিব্যস্ত হলো? এই প্রশ্নের উত্তর জনগণকেই খুঁজতে হবে। 
বাংলাদেশের সমস্যা নিচে নয়, ওপর মহলে। যে-ই সরকারে বসুক, তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জনগণের বা বাংলাদেশের সার্বিক অর্জনের মানের চেয়ে নিচু। কোনো দেশের ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব যদি সে দেশের জনগণের শিক্ষক ও দিশারি না হয়ে তাদের থেকে নিম্নমানের হয়, তাহলে এমন ধারাই ঘটে। নেতারা আমাদের দায় নেবেন কী, তাঁরাই এখন আমাদের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন! পদ্মা-নাটকে এই সত্যই আবারও ভেসে উঠল। প্রয়াত চিন্তক আহমদ ছফার কথাই আবার ফলে গেল। বহু আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন জেতে কেবল একাই জেতে। কিন্তু যখন হারে, সবাইকে নিয়ে হারে।’ বিশ্বব্যাংকের কাছে এই হার, কেবল দলীয় বা সরকারি হার নয়, এ আমাদের জাতীয় হার। 
কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। এখনো সুযোগ আছে। সরকার যদি বাদবাকি সময়ে দক্ষ, যোগ্য ও সত্ মানুষদের নিয়ে পরিকল্পনা করে প্রকল্প শুরু করতে পারে, যদি নিজেরাই টাকা ও বুদ্ধি জোগাতে পারে, তাহলে যা ছিল মন্দ, তাই হয়ে উঠবে শুভ। আমাদের কেবল একটা বড় দৃষ্টান্ত চাই। নিজেদের এই সুযোগটা সরকারের করে দেওয়া উচিত। অবকাঠামো নির্মাণ যেকোনো দেশের উন্নতির ভিত্তি। আমরা যদি আমাদের যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতকে মোটামুটি দুর্নীতিমুক্ত করতে পারি, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক নীতি গ্রহণ করতে পারি, তাহলে অন্য খাতের দুর্নীতি সত্ত্বেও দেশ এগিয়ে যাবেই। ভারত এভাবে করেছে। তার জন্য শাসক মহলকে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে, কম-বেশি টাকা বানানো বন্ধ করা না গেলেও অন্তত গ্যাস ও বিদ্যুত্ এবং পদ্মা সেতুকে দুর্নীতির আওতার বাইরে রাখব। এটা হবে আমাদের অবস্থান উজ্জ্বল করার পরীক্ষা ক্ষেত্র। এ ব্যাপারে যদি গোল্ডেন ফাইভ না পেয়েও কেবল জিপিএ-ফাইভ পাই, তাতেও চলবে। আমাদের নীতি হোক কম, কিন্তু ভালো করে। এটা একবার করতে পারলে, ঋণ দেওয়ার দেশের বা ব্যাংকের অভাব হবে না বিশ্বে। 
যমুনা সেতু এক সরকার শুরু করেছে, আরেক সরকার শেষ করেছে। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হতে পারে। যোগাযোগ খাত প্রধান সেই খাত, যেখানে গত ৩০ বছরে সরকার বদলালেও কর্মসূচির বাস্তবায়নে পরম্পরা বিরাজ করেছে। পদ্মা সেতুর বেলায়ও সেটাই হওয়া উচিত। বর্তমান সরকার শুরু করুক, পরে যে আসবে সে শেষ না করে পারবে না। শত হতাশার মধ্যেও এই একটা গাইডলাইন অনুসরণ যদি করতে না পারে, তাহলে সরকার ভোটও হারাবে, মানও হারাবে। মান গেলেও আজকাল অনেক কিছু থাকে, ভোট গেলে কী থাকে তার নজির বর্তমান বিরোধী দল। আপনারা কি সেটা চান? না চাইলে আজই শুরু করে দিন, জনগণ এই একটা ক্ষেত্রে আপনাদের পাশে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক। পরীক্ষা করেই দেখুন না প্রধানমন্ত্রী।


ফারুক ওয়াসিফ
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-02-01/news/325851

মঙ্গলবার, ৬ নভেম্বর, ২০১২

‘মন্দের ভালো’ বারাক ওবামা

সিএনএনসহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে এ কথা অবিরাম প্রচারিত হচ্ছে যে মার্কিন জনগণ ভোট দিয়ে তাঁদের দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন ঠিক, তবে এই নির্বাচন সারা দুনিয়ার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই দেশে রাষ্ট্র পরিচালনা বা পররাষ্ট্রসম্পর্কিত যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করতে সক্ষম। কিন্তু এই নির্বাচন কি আসলেই কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে? বুশ থেকে ওবামা পরিবর্তনে বিশ্বে মার্কিন ভূমিকার কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? ক্ষমতার অন্যান্য স্তম্ভ অপরিবর্তিত রেখে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনে কি ঘরে-বাইরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভব?
নির্বাচন সামনে রেখে ওবামা-রমনি বিতর্ক ঘিরে মাসাধিক কাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে উত্তেজনা ছিল। ব্যাপকভাবে জনগণের বিভিন্ন অংশ এই বিতর্ক দেখেছেন। ওই সময়ে আমার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার এবং নানা পেশার অনেকের কথা শোনার সুযোগ হয়েছিল। ওবামা-রমনি বিতর্কের প্রথমটি আমি শুনেছি সানফ্রানসিসকোতে। ওয়াশিংটনে শুনেছি ওবামা-রমনি দ্বিতীয় দফা বিতর্ক, আর বিদেন-রায়ান বিতর্ক শুনেছি নিউইয়র্কে। তৃতীয় বিতর্কের সময় ছিলাম ফিরতি পথে। প্রথম বিতর্ক শোনাকালে আমার প্রতি এই প্রশ্ন নিক্ষেপ করেছিলেন সেখানে উপস্থিত মার্কিনরা, এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কী প্রভাব ফেলতে পারে? কে নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে? উত্তর আমি দিয়েছিলাম কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে, সেটা পরে বলছি। সঙ্গে তাঁদেরও আমি একটি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘মার্কিন নির্বাচন সম্পর্কে বার্ট্রান্ড রাসেলের কথার সঙ্গে কি তোমরা একমত?’ রাসেলের কথাটি তাঁদের জানা ছিল না। বললাম, যা রাসেল বলেছিলেন, ‘মার্কিন জনগণের ট্র্যাজেডি হলো, তারা যাদের নির্বাচিত করে তারা দেশ চালায় না, আর দেশ যারা চালায় তাদের নির্বাচিত করার কোনো সুযোগ মার্কিন নাগরিকদের নেই।’ কারা তারা? এরা বৃহৎ সব বহুজাতিক সংস্থা আর এদের সহযোগী অস্ত্র ব্যবসায়ী, পেন্টাগনসহ মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্ট—সব মিলিয়ে মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স। গত মাসে ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হু ওউনস দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক বক্তব্যে এমআইটির প্রফেসর নোয়াম চমস্কিও একই কথা বললেন। এ কারণেই চমস্কি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে এদের অবস্থানে কার্যত কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। এই দুইয়ের মধ্যে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখতে সব আয়োজন শক্তিশালী।
নির্বাচনের সব কটি বিতর্কেই বেকারত্ব, ঋণগ্রস্ততা, স্বাস্থ্যসুবিধার সংকট, বৈষম্য, যুদ্ধব্যয়—এসব প্রসঙ্গ এসেছে। এসব বিতর্কেই উঠে এসেছে কিছু ভয়ংকর চিত্র; পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও সম্পদশালী দুনিয়ার অনেক অঞ্চলের সম্পদ লুণ্ঠনকারী দেশের জন্য যা অবিশ্বাস্য মনে হবে। ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থানকারী এই ব্যক্তিরাই বললেন, মার্কিন দেশে এখন প্রায় তিন কোটি মানুষ কখনো না কখনো অনাহারে থাকে। ৪ দশমিক ৭ কোটি মানুষ চিকিৎসা বিমার বাইরে, মানে চিকিৎসাসেবা নিতে অক্ষম। সমান কাজ হলেও নারীর জন্য মজুরি পুরুষের শতকরা ৭০ ভাগ। জিনিসপত্রের দাম বাড়তি। বেকারত্বের বোঝা কমেনি। নির্বাচনের আগে আগে সরকারি তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৪ দশমিক ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। শিশুদের প্রতি পাঁচজনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে।
এই বিশাল অনাহারী মানুষের জন্য কি এই সম্পদশালী দেশে সম্পদের অভাব? এটা ঠিক যে অনাহারী মানুষের খাদ্য সরবরাহের জন্য ফুড স্ট্যাম্পসহ নানা ব্যবস্থা আছে। এর জন্য বছরে বছরে খরচ বেড়েছে। ফুড স্ট্যাম্পসহ গরিবদের সমর্থনের নানা খাতে ব্যয় এখন প্রায় ৬০ বিলিয়ন (এক বিলিয়ন সমান ১০০ কোটি) মার্কিন ডলার, যা কমানোর চাপ আছে। কিন্তু এই দেশেরই কারাগারের পেছনে এখন বার্ষিক ব্যয় ৮০ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রই এখন বৃহত্তম কারাগার, অর্থাৎ বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ কারাগারে বাস করে। ১ নভেম্বর আল-জাজিরায় প্রদর্শিত এক তথ্যচিত্রে একজন মার্কিন গবেষক বলছিলেন, ‘বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে যত কৃষ্ণাঙ্গ কারাগারে আছে, সেই সংখ্যা দাসবাণিজ্যকালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের চেয়ে বেশি।’ আর এই দেশেই ৭০০ বিলিয়ন ডলার প্রতিবছর খরচ হয় অন্য দেশ দখল, গোয়েন্দাবৃত্তি আর গণহত্যায়। এই ব্যয়ে লাভবান হয় শতকরা ১ ভাগেরও কম জনসংখ্যার ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী, তেল, অস্ত্র নির্মাণসহ বিভিন্ন কোম্পানি। নানা রকম ভর্তুকি, করসুবিধা, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষতিকর বিনিয়োগ ও জালিয়াতি, দেশে দেশে অবাধ তৎপরতা এদের উচ্চ আয়ের উৎস।
সরকারি হিসাবই বলে, এই শতকরা ১ ভাগের আয় দেশের আয়ের শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ, আর শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ সম্পদ তাদের দখলে। রাসেলের মতো উদারনীতিক দার্শনিক এদের ক্ষমতার প্রতিই ইঙ্গিত করেছিলেন। এদের খাঁই পূরণ করতে গিয়ে বিশ্ব এখন স্থায়ী সন্ত্রাসের ভূমি আর যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সবচেয়ে বড় ঋণগ্রস্ত দেশ। এখন মার্কিন ঋণ প্রায় তার বার্ষিক জিডিপির সমান। ঋণের মাত্রা যা আগে নির্দিষ্ট করা ছিল, কিছুদিন আগেই কংগ্রেস তা বৃদ্ধি করেছে। বৈষম্যের মাত্রাও এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র কদিন আগে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ ঘূর্ণিঝড় স্যান্ডির আঘাতে বিপদগ্রস্ত হলো। স্থায়ী ও নিয়মিত বেতন বা মজুরি পান, তার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। অস্থায়ী, খণ্ডকালীনও অনেকে। স্বাস্থ্যবিমাহীন, খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসার সমস্যায় যাঁরা আগেই ছিলেন, তাঁদের নাজুক অবস্থা আরও বাড়ল। নিউ অরলিন্সে বুশ আমলের ঘটা ক্যাটরিনার ক্ষত অনেকের জন্য এখনো পুরোপুরি সারেনি। লক্ষাধিক মানুষ তখন গৃহহীন হয়েছে। এই দরিদ্র মানুষের জন্য কোনো জাতীয় পরিকল্পনা তখন দেখা যায়নি। ঋণের বোঝা বেড়েছে তাদের। কিন্তু পুনর্গঠনের নামে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির হেলিবার্টনসহ কয়েকটি কোম্পানি ঠিকই বিলিয়ন ডলার কন্ট্রাক্ট পেয়েছে।
মার্কিন আগ্রহী শ্রোতাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমাদের কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরলাম। ২০০১ সালের ১৫ মে ঢাকায় এক বক্তব্যে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মেরি অ্যান পিটার্স কয়েক মাস পরে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের নির্বাচনে যাঁরা ক্ষমতায় আসবেন, তাঁদের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় ঠিক করে দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল মার্কিন কোম্পানি ইউনোকলের প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতে গ্যাস রপ্তানি ও চট্টগ্রাম বন্দরকে মার্কিন এক কোম্পানির হাতে ২০০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া। সেটা ছিল জুনিয়র বুশ আমল। সেই বুশ আমলের আট বছর এই একই ধারায় আরও তৎপরতা চলেছে। এরপর ২০০৮ সালে শুরু হলো ওবামা আমল। উইকিলিকস সূত্র পরিষ্কার করেছে, এই আমলের রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি জ্বালানি উপদেষ্টাকে বিশেষভাবে ধরেছেন কনোকোফিলিপসের সঙ্গে গ্যাস রপ্তানিমুখী চুক্তি সম্পাদন করতে। একই সঙ্গে তিনি বিশেষ জোর দিয়েছেন, এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খনি অতিশিগগিরই অনুমতি দেওয়ার জন্য। লন্ডনে তালিকাভুক্ত ও জনপ্রতিরোধের মুখে বিতাড়িত একটি অনভিজ্ঞ কোম্পানির মাধ্যমে মাটি-পানি-মানুষবিনাশী একটি ধ্বংসযজ্ঞের প্রকল্প বাস্তবায়নে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কেন এত আগ্রহ? উত্তর আসে উইকিলিকসে পাওয়া তাঁর বক্তব্য থেকেই। তিনি বলেছেন, এতে তাদের শতকরা ৬০ ভাগ স্বার্থ আছে। এটি ছিল ২০০৯ সালের জুলাই মাসের ঘটনা। তিনি গেলেন। এরপর বর্তমান রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা গত কিছুদিনে অনেক বক্তব্য দিয়েছেন। কয়েক দফায় তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, অবশ্যই ফুলবাড়ী উন্মুক্ত খনির প্রকল্প তাড়াতাড়ি চালু করতে হবে। বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লকসহ আরও সর্বনাশা চুক্তি করাসহ তিনি বাংলাদেশ থেকে গ্যাস, কয়লা এমনকি বিদ্যুৎও রপ্তানির ওপর জোর দিয়েছেন (ডেইলি সান, ১২ অক্টোবর ২০১২)। নিরাপত্তার নামে নানা সামরিক চুক্তির বিষয়েও একই ধারাবাহিকতা দেখা যায়। ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতির’ সব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে মার্কিন সব সরকারই বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য আমদানির ওপর উচ্চ শুল্কহার বসিয়ে রেখেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘বিদেশি সাহায্য’ নামে যে পরিমাণ অর্থ আসে, তার চার গুণ তারা আয় করে বাংলাদেশের গার্মেন্টসের ওপর আরোপিত উচ্চহারের শুল্ক থেকে। এসব দৃষ্টান্ত দেখিয়েই বললাম, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে কোনো পার্থক্য আমরা টের পাই না। আমার কথা শুনে শ্রোতাদের মধ্য থেকেই একজন বললেন, এসব দূতাবাস যার করের পয়সায় চলে, সেই মার্কিন জনগণের প্রতিনিধিত্ব তারা করে না। তারা আসলে বৃহৎ করপোরেট স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকে!
উপস্থিত অধিকাংশই ছিলেন ‘আমরা ৯৯ শতাংশ’ আন্দোলনের অংশীদার।
মার্কিন জনগণ ওবামার ওপর অনেক ভরসা করেছিলেন। পরিবর্তনের কথা বলেই তিনি প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসেছিলেন। নির্বাচনের আগে আগে তাঁর লেখা অডাসিটি অব হোপ গ্রন্থটি তরুণদের মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছিল। মানুষ তখন বুশ-চেনি-রামসফেল্ড-রাইস চক্রের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মরিয়া। ক্ষমতায় এসেছিলেন ওবামা। তিনি পরিবর্তন করতে পারেননি, নিজেই পরিবর্তিত হয়েছেন মেশিনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য। যতটুকু ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাতেই রিপাবলিকানদের প্রচারণায় তিনি বামপন্থী! এবারে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, ওবামার এককালীন সমর্থকেরা সাধারণভাবে হতাশ, কিন্তু রমনির ভয়েই শেষ পর্যন্ত তাঁদের ওবামাকেই ভোট দিতে হবে। কেননা, দেশের ভেতরে ওবামা কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না আনতে পারলেও রমনি যে রিপাবলিকানদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের নীতি ও কর্মসূচি ধনিক শ্রেণীর পক্ষে। শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, অশ্বেতাঙ্গ, ইমিগ্র্যান্ট ও নারীর জন্য আরও প্রতিকূল। সেটাই ব্যর্থতা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ সত্ত্বেও ওবামার প্রধান ভরসা।
শিল্পায়িত বিশ্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে অসংগঠিত। অভিবাসীদের দেশ হওয়ার কারণে বিভক্তি বজায় রাখা খুব সহজ। শতকরা মাত্র সাতজন সেখানে ইউনিয়নভুক্ত। বাকি সবাই অসংগঠিত। নানা ধরনের শ্রমিকেরা সংখ্যায় গরিষ্ঠ হলেও তাঁদের অস্তিত্ব ঢেকে ফেলার চেষ্টাই বরাবর সফল হয়েছে। মে দিবস তৈরি হয়েছিল এই যুক্তরাষ্ট্রেরই শিকাগো শহরে, অথচ মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রশাসিত দেশগুলোর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রই হচ্ছে উল্লেখযোগ্য দেশ, যেখানে মে দিবস সরকারিভাবে স্বীকৃত নয়। শ্রমিকদের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা ভুলিয়ে দেওয়ার জন্যই এই আয়োজন। মিলান কুন্ডেরার ভাষায়, মানুষের লড়াই আসলে ভুলিয়ে দেওয়ার জাল থেকে নিজেকে উদ্ধার করা। সে জন্যই যুক্তরাষ্ট্রে ‘আমরা ৯৯ শতাংশ’ নামে নতুন পরিচয়ের উদ্ভব হয়েছে। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তা এখনো স্পষ্ট রূপ নেয়নি। তার ফলে নির্বাচনের নামে ১ শতাংশ ধনপতিদের মুখপাত্র বাছাইয়ের এই বছরের পর্বেও মানুষের সামনে অপশন বা বাছাই করার সুযোগ সীমিত—‘বিগ অর বিগার এভিল’। এই অসহায়ত্ব বাংলাদেশের মানুষকে বুঝিয়ে বলতে হবে না।
৩ নভেম্বর ২০১২
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২

দ্য লোডশেডিং রিটার্নস

রতিবছর আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে লোডশেডিং। লোডশেডিংকে আমরা আর হারাতে চাই না। হূদয়গ্রাহী পারফরম্যান্সের জন্য একে ‘গোল্ড মেডেল’ দেওয়া উচিত। আমাদের শোবার ঘরে ‘নিরাপত্তা’ ঢুকতে না পারলেও ‘লোডশেডিং’ ঠিকই ঢুকে বসে থাকে! সময় মেনে, নিয়ম মেনে আসা-যাওয়া করে। জাতীয় জীবনে তার অবদান কতটা awesome, তা জানাতেই মোমবাতির আলোয় বসে এই লেখা লিখছি।
এ যুগে ‘অ্যানালগ সামাজিকতা’ বিরল বস্তু। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কল্যাণে তা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। লোডশেডিংয়ের সময় গরমে ‘হিট স্ট্রোকের’ ভয়ে রাত-বিরাতে অনেকে বাসা থেকে বের হয়। ফলে প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আবার বসতবাড়ির চারপাশে এই লোকসমাগম হওয়ায় চোর-ছেঁচড়দের উৎপাত কমে গেছে। পরিণামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে কেউ কেউ চলে যায় ছাদে। জ্যোৎস্নার আলো খেতে খেতে অণুকাব্য রচনা করে। এভাবে সামষ্টিক সুকুমারবৃত্তির চর্চা হওয়ায় ‘লোডশেডিংয়ের রাজ্যে পৃথিবী পদ্যময়’ হয়ে ওঠে!
ছুটির দিনেও লোডশেডিংয়ের কর্মতৎপরতা আমাদের আবেগাপ্লুত করে! এ থেকে আমরা কর্মঠ হওয়ার শিক্ষা পাই। কিন্তু এতটুকু শিক্ষা দিয়েই সে ক্ষান্ত হয় না। রাতে খেয়েই যাঁদের ঘুমানোর বদভ্যাস রয়েছে, তাঁদের মহৌষধ লোডশেডিং। বিছানায় শোয়ামাত্রই বিদ্যুৎ চলে যায়। বাধ্য হয়ে তাঁরা বিছানা থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করেন। এভাবে জাতীয় সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া ভ্যাপসা গরমে মধ্যরাতে বীরদর্পে ঘরে ঢুকে পরের দিনের কাজের জন্য লোডশেডিং আমাদের ‘ওয়ার্ম আপ’ করে!
দেশে চলছে হিন্দি সিরিয়ালের আগ্রাসন। তাই দরকার আমাদের সংস্কৃতির পুনর্বাসন। লোডশেডিংয়ের ঝাকানাকা অবদানে আমরা শিগগিরই ফিরে পাব হারানো সিংহাসন! কারণ বিদ্যুতের অভাবে হিন্দি চ্যানেল দেখা যায় না, যদিও অন্যান্য চ্যানেলও পটল তোলে। অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের ফলে আমাদের অজুহাত দেওয়াও অনেক সহজ হয়েছে! অন্ধকারে ঠিকমতো রান্না করা যায় না—এই অজুহাতে গিন্নিরা রান্না থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন। একই অছিলায় হোমওয়ার্ক না করেও পার পেতে পারে ছাত্রছাত্রীরা। কয়েকটি সিম দিয়ে যারা একাধিক প্রেম করে, তারা মোবাইল বন্ধের জন্য প্রেমিকাদের কাছে সহজেই কৈফিয়ত দিতে পারে, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে মোবাইলে চার্জ ছিল না।’ লোডশেডিং আমাদের ধৈর্য বাড়াতেও অবদান রাখছে। এত লোডশেডিংয়ের মধ্যেও আমরা যে হাসিমুখে সময় কাটাচ্ছি, এটা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্য, যান চলাচল ইত্যাদিতে চরম অনিয়ম সত্ত্বেও আমরা হেসেখেলে জীবন পার করছি। এ জন্য আমাদের প্রত্যেকের নাম ‘রিপ্লিজ বিলিভ ইট অর নট’-এ অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
পৃথিবীতে শক্তির অপচয় রোধে কত কিছুই না করা হচ্ছে! শক্তির এই অপচয় রোধে আমরা প্রতিনিয়ত দৃষ্টান্ত তৈরি করে চলেছি। এটা সম্ভব হচ্ছে লোডশেডিংয়ের ফলেই। আরেকটু চেষ্টা করলেই আমরা লোডশেডিংয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি। তখন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে আমাদের কিছুই যাবে-আসবে না! তদুপরি, লোডশেডিংয়ের বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে পারলে অতিরিক্ত লোডশেডিং বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা যেতে পারে! যুগে যুগে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কত কিছু আবিষ্কার করা হয়েছে। তেমনি একটু খাটুনি খাটলেই লোডশেডিং ব্যবহার করেও হয়তো নতুন কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব হবে!
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজের জন্য অল্প হলেও বিদ্যুতের প্রয়োজন। যেমন, ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেটিং। অভিমানের সুরে নয়, অভিযোগের তালে বলছি, দূর-দূরান্ত থেকে আসা ‘অতিথি বিদ্যুৎ’ আমাদের দরকার নেই। বায়োগ্যাস বা সোলার প্যানেলের সাহায্যে আমরা ল্যাপটপে চার্জ দিতে পারি। বিদ্যুৎহীনতায় যাঁদের ব্যবসায় লালবাতি জ্বলেছে, তাঁরা কাছা মেরে আইপিএসের ব্যবসায় নেমে পড়ুন। দরকার হলে আইপিএস ব্যবহার করব; তবুও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিদ্যুৎকে আমরা ঘরে ঢুকতে দেব না। আসুন, আমরা স্বাগত জানাই লোডশেডিংকে। বৈশাখ আসার আগেই গেয়ে উঠি, ‘এসো হে লোডশেডিং, এসো এসো!’

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-04-09/news/238964

শুক্রবার, ২৪ আগস্ট, ২০১২

বাড়ি আমার, আমি বাড়িতে থাকি, কিন্তু বাড়ির কাজকর্মে আমার কথা চলে না।...

জাতির জীবনে এটা একটা কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমাদের সরকার গরিব মহিলাদের মালিকানায় এবং তাদেরই তত্ত্বাবধানে সুপরিচালিত বিশ্বময় সুপরিচিত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তার মৌলিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে অন্য রকম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করল। এ দুঃখ ধারণ করার ক্ষমতা আমার নেই।
কী করেছিল গ্রামীণ ব্যাংক, যার জন্য তাকে তার মৌলিকত্ব হারাতে হলো?
৮০ লাখ গরিব মহিলা নিজেদের অর্থে শেয়ার কিনে এটার মালিকানায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। ৯৭ শতাংশ মালিকানা তাদের। সরকারের মালিকানা ৩ শতাংশ। নিজেদের পয়সায় পরিচালিত এই ব্যাংক একটা বৃহৎ সমবায়ের মতো। এটা নিজের অর্থে চলে। সরকার বা বিদেশ থেকে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এটা কোনো ঋণ নেয় না, অনুদান নেয় না। তবু কেন বিশ্বব্যাপী বহুলভাবে অনুকরণকৃত এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এই প্রতিষ্ঠানকে সরকারের অন্য দশটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলো?
সরকার বলছেন যে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এই অচলাবস্থা কে সৃষ্টি করেছিল? ব্যাংকের মালিকেরা আইনগত প্রক্রিয়ায় একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য সিলেকশন কমিটি গঠন করেছিলেন। যেহেতু এই সিলেকশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁরা আমার নাম এবং অন্যান্য সদস্য হিসেবে ড. আকবর আলি খান এবং জনাব খালেদ শামসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন, সরকারের প্রতিনিধি, বোর্ডের চেয়ারম্যান এই প্রস্তাব বোর্ডের সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ থাকেন। অদ্ভুত পরিস্থিতি। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ডে ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা আইন কাউকে দেয় নাই। চেয়ারম্যান সাহেব গায়ের জোরে ভেটো দিয়ে যেতে থাকলেন পর পর তিনটি বোর্ড মিটিংয়ে। একেই বলা হচ্ছে অচলাবস্থা। তার জন্য এখন আইন সংশোধন করে পুরো ব্যাংকের ভবিষ্যৎটাই মূলত চেয়ারম্যান সাহেবের হাতে তুলে দেওয়া হলো।
সরকার থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ‘আমরা গ্রামীণ ব্যাংক দখল করিও নাই, করতে যাচ্ছিও না। ইউনূস সাহেব মিথ্যাচার করছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকদের কর্তৃত্ব আগের মতোই আছে। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই চেয়ারম্যান সিলেকশন কমিটি গঠন করবেন।’ পরামর্শ কখন করে, আর ভোট কখন নেয়? যখন ক্ষমতা একজনের হাতে থাকে তখন পরামর্শ করে। ভোট নেয় যখন ক্ষমতা ভোটদাতাদের কাছে থাকে। গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশ সংশোধন করে এখন মালিকদের ভোটদানের ক্ষমতা রহিত করে তাদেরকে ‘পরামর্শ’ দেওয়ার ভূমিকায় রাখা হলো। তারপর একক চেয়ারম্যান কর্তৃক তৈরি সিলেকশন কমিটি তিনটি নাম বোর্ডের কাছে দেবে। বোর্ডের সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ থাকবে যে এই প্রার্থীরা চেয়ারম্যানের চোখের দিকে তাকিয়ে কাজ করবেন। মালিকদের চোখের দিকে তাকিয়ে কাজ করবেন না। যাঁকেই তাঁরা নিয়োগ দিন না কেন, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
যে বোর্ডের কাছে সমস্ত ক্ষমতা আগের মতোই রয়ে গেছে বলা হচ্ছে, সে বোর্ড কিছু জানার আগেই সরকার থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে বোর্ড সদস্যরা যা চাচ্ছেন তা হতে দেওয়া হবে না। কেন হতে দেওয়া হবে না? কারণ ক্ষমতা সরকারের হাতে। সরকার বলছে ‘সিলেকশন কমিটি’ এক সপ্তাহের মধ্যে হয়ে যাবে। এটা কি বোর্ডের কথা, নাকি সরকারের কথা? এবং তাতে ইউনূস থাকবে না। কারণ কী? কারণ সরকার এটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। এটা কি বোর্ডের সিদ্ধান্ত? ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন আকর্ষণীয় অঙ্কের হবে, তা না হলে আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওয়া যাবে না। এটা কি বোর্ডের সিদ্ধান্ত?
অথচ সরকার বলেই যাচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। সরকার আইন সংশোধনের আগেই এত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, আইন সংশোধনের পরে কী হয়, এবার আমাদের দেখার পালা।
আইনে সংশোধনী এনে সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নিয়োগে ভূমিকা রেখে প্রকারান্তরে গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার দায়দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিল। দুনিয়ার কোথাও নজির নাই যে বহুজনের ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ক্ষমতা ৩ শতাংশ মালিকানার অংশীদারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশ সংশোধনের ব্যাপারে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর আমি দেশের মানুষের প্রতি আবেদন জানিয়েছিলাম সরকারকে বোঝানোর জন্য, যাতে সরকার এই সংশোধনের পথে অগ্রসর না হয়। দেশের বহু মানুষ বিবৃতির মাধ্যমে, সভা ও মানববন্ধনের মাধ্যমে, গণমাধ্যমে আলোচনা ও লেখালেখির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিশেষ করে, দলমত-নির্বিশেষে দেশের বহু সম্মানিত মহিলা নেত্রী এ ব্যাপারে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। গরিব মহিলাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমি তাঁদের সকলকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শুধু দুঃখ রইল যে সরকার আমাদের কারও কথা শুনল না।
এই সংশোধনীর ফলে গ্রামীণ ব্যাংকের গৌরবময় ইতিহাসের সমাপ্তি পর্বের সূচনা হলো। এখন থেকে গরিব মহিলাদের মালিকানার ব্যাংকটি সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে পরিচালিত হবে। ইতিহাসে নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না যে এ রকম পদক্ষেপের ফলে প্রতিষ্ঠানের মঙ্গল হয়েছে।
আমি আমার দুঃখ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। গ্রামীণ ব্যাংকের অসংখ্য কর্মী সারা জীবন পরিশ্রম করে একটি স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য এই ব্যাংকটিকে দুনিয়ার একটা অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছিল। আজ এর সমাপ্তি হতে দেখে তারাও তাদের দুঃখ রাখার জায়গা পাচ্ছে না।
যে গরিব মালিকেরা তাদের নগদ পয়সা দিয়ে এটার শেয়ার কিনে এটাকে ‘আমাদের ব্যাংক’ হিসেবে জানতে শিখেছিল, গৌরব করতে শিখেছিল, তারা এখন জানবে যে এটা এখনো তাদের ব্যাংক বটে তবে এর ব্যাপারে মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন
তাদের হাতে নেই। বাড়ি আমার, আমি বাড়িতে থাকি, কিন্তু বাড়ির কাজকর্মে আমার কথা চলে না।
আমি আশাবাদী মানুষ। আমি হতাশ হতে চাই না। নিজের মনে আশার ক্ষীণ আলো জাগিয়ে রাখতে চাই। আমি আগের মতো আবারও দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানাচ্ছি যে, তাঁরা যেন এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করেন। আমি দেশের তরুণদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন একদিন গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকদেরকে এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে। গরিব মালিকদের পরিবারের তরুণেরাও যেন এই প্রতিজ্ঞা করে যে, তাদের মায়েদের সম্পদ তারা তাদের মায়েদেরকে ফেরত এনে দেবে। তাদের ব্যাংক তাদের কাছে যেন আবার পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরে আসে। আশা করি ভবিষ্যতে একদিন আমাদের দেশে এমন সরকার আসবে, যাদের প্রথম কাজ হবে, একটি জাতীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গরিব মহিলাদের এই ব্যাংকটিকে গরিব মহিলাদের হাতে তুলে দিয়ে এই ব্যাংকের গৌরবময় অগ্রযাত্রাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। সেদিন দেশের সকল মানুষ স্বস্তি পাবে, গরিব মহিলাদের মঙ্গলকামী পৃথিবীর সকল মানুষ স্বস্তি পাবে।
আজ দুঃখের দিনে সে রকম একটি সুখের দিনের কথা চিন্তা করা ছাড়া মনকে সান্ত্বনা দেবার আর কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।
 ড. মুহাম্মদ ইউনূস: গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী।
 
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-08-24/news/283340