Powered By Blogger

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্ত


বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্ত কোনটি? এ প্রশ্নের জবাবে আমাদের মনে ভেসে উঠতে পারে ফিলিস্তিনিদের গাজা ভূখণ্ডের সঙ্গে ইসরায়েলের সীমান্তের কথা। কেননা, বছরের পর বছর সেখানকার বহু ফিলিস্তিনির নিষ্ঠুর হত্যার খবর বিশ্বের প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছে। এখন অবশ্য ২৫ মাইল সীমান্তজুড়ে তারা গড়ে তুলেছে নিরাপত্তাপ্রাচীর এবং পাঁচটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ। অবশ্য, গাজা এখন কার্যত বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত জেলখানা। অন্য আর যে সীমান্তে রক্ষীদের গুলিতে প্রাণহানির কথা শোনা যেত, সেটি হলো আমেরিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্র আর মেক্সিকোর সীমান্ত। কিন্তু গুগলে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে এই প্রশ্নের উত্তরটি হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। কেননা, সংখ্যার দিক থেকে সীমান্তে প্রাণহানিতে বিশ্ব রেকর্ডটি আমাদেরই। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে হতাহতের সবাই না হলেও অন্তত ৯৫ শতাংশই বাংলাদেশি।
কিছুদিন পর পর সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে খবর চোখে পড়লেও বিষয়টি যে একটা বিশ্ব রেকর্ডে দাঁড়িয়েছে, সেটা প্রথম গণমাধ্যমের নজরে আসে বছর চারেক আগে ব্রিটেনের চ্যানেল ফোর-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের এই আচরণ যে এতটা ভয়াবহ এবং গুরুতর রূপ নিয়েছে, সেটা বুঝতে না পারার কারণ প্রধানত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা। সামগ্রিকভাবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সন্দেহভাজনদের হত্যার বিষয়টিকে যে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেটা বুঝতে আমাদের সময় লেগেছে অনেক।
‘ইন্ডিয়া’স গ্রেট ওয়াল—দ্য ওয়ার্ল্ডস ডেডলিয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রচারিত হয় ২০০৯ সালের ২৩ জুলাই। চ্যানেল ফোরের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সংবাদদাতা জোনাথন রাগম্যানের প্রায় সাড়ে আট মিনিটের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি ইন্টারনেটে এখনো পাওয়া যায়। তাঁর প্রতিবেদনে তিনি দেখিয়েছেন যে সীমান্তে হতাহত ব্যক্তিদের সবাই গরু পাচারকারী অথবা চোরাকারবারি নন। এসব অবৈধ কারবারে কেউ কেউ নিশ্চয়ই জড়িত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দুর্ভোগ এবং বিপদের শিকার হচ্ছেন সীমান্ত এলাকার সাধারণ কৃষক এবং তাঁদের পরিবারগুলো। চাষাবাদের কাজ করার সময় বিএসএফের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন অথবা গুলি খেয়ে বেঁচে গেছেন এ রকম বেশ কিছু গ্রামবাসীর সাক্ষাৎকার রয়েছে ওই প্রতিবেদনে। অভিন্ন নদীর প্রবাহে সীমান্ত বিভাজন হয়েছে এ রকম তিস্তার এক অংশে নৌকায় বাংলাদেশি নারীদের একটি দলকে পাচারের দৃশ্যও তাঁর প্রতিবেদনে রয়েছে। সীমান্তে যে প্রায় দুই হাজার মাইলজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি হচ্ছিল, তার পাশ ধরে লোকজনের চলাচল এবং সীমান্তরক্ষীদের সতর্ক নজরদারি ওসব জনপদের মানুষের জীবনযাত্রায় যে কী ধরনের ছন্দপতন ঘটিয়েছে, তার প্রতিফলন আছে জোনাথনের প্রতিবেদনে।
কিন্তু চ্যানেল ফোরের প্রতিবেদন ইংল্যান্ডের দর্শকদের আলোড়িত করলেও বাংলাদেশ বা ভারতে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। এই দুই দেশের কোনো টিভি চ্যানেল ফোরের ওই প্রতিবেদন পুনঃপ্রচার অথবা তারপর কী ঘটছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে নিজস্ব কোনো রিপোর্ট বা অনুষ্ঠান করেছে বলে শোনা যায়নি। অথচ, বিষয়টি নিয়ে দুই দেশেই জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক সূচনার মতো ‘ফলোআপ’ করার এক চমৎকার সুযোগ তখন তৈরি হয়েছিল। সুযোগ বলছি এ কারণে যে এ ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য বিশেষভাবে বাংলাদেশে কোনো চ্যানেলই অর্থের সংস্থান করে না। সুতরাং বড় ধরনের অনুসন্ধানের কাজ ছাড়াই চ্যানেল ফোরের প্রতিবেদনকে তখন কাজে লাগানোর একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
চ্যানেল ফোরের রিপোর্টেরও দেড় বছর পর ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এ ধরনের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ‘ট্রিগার হ্যাপি’ শিরোনামে বিশদ আকারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই শতকের প্রথম ১০ বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে নিহত হয়েছেন এক হাজারের মতো বাংলাদেশি, যার অর্থ হচ্ছে গড়ে প্রতিবছর ১০০ জন অর্থাৎ প্রতি সাড়ে তিন দিনে একজন করে বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। কোনো ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়া শান্তির সময়ে কোনো দেশ তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নাগরিকদের এই হারে হত্যা করছে—এটা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজ বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেবে তা কল্পনা করাও দুষ্কর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতেও যেমন বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে, তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা এর ভয়াবহতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা ফেলানীর নিথর দেহের ছবি সাময়িকভাবে আমাদের কিছুটা বিচলিত করলেও সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে সবাই ব্যর্থ হয়েছেন। এই ব্যর্থতা শুধু ক্ষমতাসীনদের একার নয়, এর আগে যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন তাঁদেরও।
ফেলানী হত্যার বিচার বিএসএফের আদালতে না করে ফৌজদারি আদালতে অনুষ্ঠানের জন্য ভারতের কাছে বাংলাদেশ কোনো দাবি জানিয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। নাকি সরকার আশা করেছিল বিএসএফ তাদের নিজেদের বিচারে নিজেদের দোষী সাব্যস্ত করবে? ‘সীমান্তে সন্দেহভাজনদের গুলি করা বন্ধ হবে না’ মর্মে বিএসএফের সাবেক প্রধান ইউ কে বনশলের বহুল প্রচারিত বক্তব্য (ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১২ বিবিসি) বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিরা কি ভুলে গিয়েছিলেন? ফেলানীর হত্যাকারী তো তাঁর বাহিনীপ্রধানের নির্দেশনাই অনুসরণ করেছেন। তাহলে সেই বাহিনীর আদালত কেন তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করবেন?
২০১১ সালের ২৫ জুলাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে চিঠি দিয়ে সীমান্তে নতুন করে হত্যা এবং নির্যাতনের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর দ্রুত ও স্বচ্ছ ফৌজদারি তদন্ত এবং ন্যায়বিচার দাবি করেছিল। ওই চিঠিতে তারা বলেছিল, ‘শ্রীলঙ্কার সমুদ্রসীমায় প্রবেশের কারণে ভারতীয় জেলেদের বিরুদ্ধে কলম্বো কোনো পদক্ষেপ নিলে ভারত যখন প্রতিবাদ করে, তখন তাদেরই সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের এত দ্বিধা কেন?’ এ ধরনের যুক্তি বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের কণ্ঠে শোনা যায় না। বন্ধুরাষ্ট্রের কাছে এটুকু নৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে না পারলে সেই সম্পর্কে বন্ধুত্বের আর কি অবশিষ্ট থাকে?
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের আরেকটি খবরের উল্লেখ এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ঝুঁকি নির্ধারণের একটি গবেষণা চালায়। তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কী ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি হতে পারে, তার সম্ভাব্য কয়েকটি কাল্পনিক অবস্থার বিশ্লেষণ করা হয়। এতে যেসব সম্ভাব্য চিত্র তাদের সামনে উত্থাপিত হয়, তার একটি ছিল বাংলাদেশের একটি বিশাল এলাকা সাগরে তলিয়ে যাওয়ার কারণে কোটি মানুষের বাস্তুহারা হওয়া। এসব বাস্তুহারা স্বভাবতই বাঁচার আশায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতমুখী হতে চাইবে এবং তখন যে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেবে, সেটা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দিতে পারে।
একাত্তরে কোটি খানেক বাংলাদেশিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ভারতের পক্ষে কি মেনে নেওয়া সম্ভব? সুতরাং দুই হাজার মাইল কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ তো একটা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। বিএসএফের নিষ্ঠুরতার কারণে এই সীমান্তে বাংলাদেশিদের সন্ত্রস্ত রাখাটাই হয়তো তাদের কৌশলের অংশ। সীমান্ত এলাকায় চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) মোতায়েনের ঘোষণা (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৩) এ ধারণাকেই সমর্থন করে। যদিও বিএসএফ-প্রধান বাংলাদেশ সীমান্তে এ ধরনের পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছেন। অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, ভারতে সন্ত্রাসীদের কথিত অনুপ্রবেশের সমস্যা পাকিস্তান সীমান্তে প্রকট হলেও ভারতের কাছে বাংলাদেশ সীমান্তের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। এর উপসর্গ বা লক্ষণ হিসেবে তাই তারা বলে থাকে যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান, চীন কিংবা মাওবাদী সন্ত্রাসকবলিত নেপালের সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা বাংলাদেশ সীমান্তের মতো এতটা নয়।
সীমান্ত সম্মেলনের মতো বিচ্ছিন্ন আলোচনা বা উদ্যোগে ভারতের এই সীমান্ত রক্ষানীতিতে যে পরিবর্তন আসবে না, সেটা বোঝার জন্য ইতিমধ্যেই অনেক কালক্ষেপণ হয়েছে। প্রাণ গেছে অনেক বেশি নিরীহ বাংলাদেশির। অথচ এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা শুধু এখনো পর্যন্ত শুধু বক্তৃতা-বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ। সীমান্তে হত্যা বন্ধের জন্য ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির ন্যূনতম একটি পদক্ষেপ হতে পারে জাতীয় সংসদে সর্বদলীয় প্রস্তাব পাস, যাতে তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায় যে তাদের নাগরিকের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, ছোট প্রতিবেশীর অনুভূতি তার থেকে আলাদা নয়। অন্যান্য রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়ে নিজেরা একে অপরকে রাজপথে মোকাবিলায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকলেও সীমান্তে মৃত্যুর মিছিল বন্ধে অন্তত একটা সমঝোতা হওয়া উচিত। তাহলে ওই প্রস্তাবে গণতান্ত্রিক ভারতের নেতাদের এ কথাটিও স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাবে যে ‘ট্রিগার হ্যাপি’ পরিচয়টি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মর্যাদা বাড়ায় না। সামগ্রিক সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন না ঘটিয়েও তা সম্ভব হতে পারে।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

শুক্রবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৩

গোলাম আযমের বিচারপ্রক্রিয়া ‘ত্রুটিপূর্ণ’: এইচআরডব্লিউ

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছে, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গোলাম আযমকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রক্রিয়া ভুল এবং বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয়নি।

এইচআরডব্লিউর এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, সংস্থাটির বিবৃতি ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘অযৌক্তিক’।

‘বাংলাদেশ: আযম কনভিকশন বেজড অন ফ্লড প্রসিডিংস’ শীর্ষক ওই বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ  বলেছে, ‘গোলাম আযমের রায় দেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) নিজ উদ্যোগে তদন্ত চালানোর যে কথা জানিয়েছেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল তা করতে পারেন না। ট্রাইব্যুনালের তদন্তের বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও অবগত ছিলেন না বলে বিচারকদের সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণের বিরুদ্ধে তাঁরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে বা কথা বলতে পারেননি। ফলে তা বেসামরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৪ ধারাকে লঙ্ঘন করেছে। কারণ, বাংলাদেশও এই চুক্তিতে সই করেছে।’

স্কাইপসহ অন্যান্য মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও বাইরের পরামর্শকদের মধ্যে কথোপকথন-বিষয়ক ‘দি ইকোনমিস্ট’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে পক্ষপাতের যে অভিযোগ উঠেছে, ট্রাইব্যুনাল তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। কয়েকটি কথোপকথনে গোলাম আযমের প্রসঙ্গ রয়েছে। একটি কথোপকথনে প্রসিকিউশনের জন্য বিচারকদের নীলনকশার প্রসঙ্গ রয়েছে, যাতে উল্লেখ রয়েছে, কীভাবে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে, কোন সাক্ষীকে আগে ডাকতে হবে, কীভাবে সাক্ষীকে জেরা করতে হবে। এসব কথোপকথনে পরিষ্কার হয়ে গেছে, গোলাম আযমের মামলা সাজানোর ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা প্রসিকিউশনকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
গোলাম আযমের বিচারপ্রক্রিয়ায় পাঁচটি বিষয়কে ‘ত্রুটি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এইচআরডব্লিউর বিবৃতিতে। এগুলো হলো, প্রসিকিউশনের পক্ষে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের অযথার্থ তদন্ত পরিচালনা, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব, আসামিপক্ষের সাক্ষীদের নিরাপত্তায় পদক্ষেপ নিতে সরকারের ব্যর্থতা, ট্রাইব্যুনালের বিচারক পরিবর্তন, সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণের ঘাটতি।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যে আইন ও প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে, তার ত্রুটির বিষয়ে আমরা নিজেদের উদ্বেগের কথা বাংলাদেশের সরকারকে জানিয়েছি। তবে তারা তা আমলে নেয়নি। যে রায় সরকার চেয়েছিল, তা তারা পেয়েছে। কিন্তু সরকার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
এইচআরডব্লিউর বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে টেলিফোনে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ জানান, সংস্থাটির যে যুক্তির ওপরে বিবৃতি দিয়েছে, তা ভিত্তিহীন।
আইনমন্ত্রী তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হচ্ছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ ও সময় দেওয়া হয়েছে। কাজেই ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত ইউএনবিকে বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায় সম্পর্কে মন্তব্য করার এইচআরডব্লিউ কে? রায় ভুল না সঠিক ছিল, তা সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত দেবেন। এইচআরডব্লিউ এর দায়িত্ব নিচ্ছে কেন?
রানা দাশগুপ্ত দাবি করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ করা লবিস্টদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে এইচআরডব্লিউ এ ধরনের বিবৃতি ছড়াচ্ছে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি, দুষ্কর্মে সহযোগিতা, হত্যা, নির্যাতনের অভিযোগে ২০১০ সালের মার্চ মাসে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ আনা হয়। সব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত ১৫ জুলাই ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেন। ১২ আগস্ট প্রসিকিউশন অধিকতর শাস্তির দাবিতে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে।

সোমবার, ১২ আগস্ট, ২০১৩

Bangladesh police arrest activist over 'fabricating information' on atrocities

Adilur Rahman Khan, secretary Odhikar. His arrest has been condemned by Human Rights Watch and other organisations. Photograph: Indrajit Ghosh/Demotix/Corbis
Authorities in Bangladesh have arrested a leading human rights activist on charges of "fabricating information" about atrocities committed by state security forces in a government crackdown this year.
Plainclothes police officers arrested Adilur Rahman Khan, secretary of Bangladeshi human rights organisation Odhikar, at his home  on Saturday night as he returned with his family.
Bangladesh has been hit by protests and demonstrations ahead of elections due later this year. Prime Minister Sheikh Hasina's government has come under fire from the opposition for, among other things, a controversial trial of war criminals and numerous cases of alleged corruption against its ministers. At least 150 protesters have reportedly been killed in clashes with police since February, according to Human Rights Watch.
Khan's organisation has been critical of human rights abuses allegedly committed by Bangladeshi security forces, including torture, extra judicial killings and enforced disappearances.
His organisation reported that between January and June 2013, 184 people were illegally killed by Bangladeshi law enforcement agencies. 
His lawyers applied for bail for the rights chief today but the petition was rejected.
"Adilur Rahman Khan is a lawyer of the supreme court of Bangladesh, he is a former deputy attorney general and he is a human rights defender. It is an insult and shame that a magistrate can actually pass an order of remand on a fellow officer of the court," said Saira Rahman Khan, the activist's wife and founding member of Odhikar. She continued,: "Neither Odhikar nor he works for any political party but for human rights and the people of Bangladesh."
Human Rights Watch condemned Khan's arrest. "Adil is one of the leading human rights activists in Bangladesh and someone we have worked with closely on sensitive issues such as extrajudicial killings, torture and labour rights," Brad Adams, the organisation's Asia directortold the Guardian.
Adams continued: "He has been a strong critic of each of the past governments and has been threatened and followed for a long time. We are concerned for his safety. It appears he is being persecuted for his criticism of the current government."
British high commissioner in Bangladesh Robert Gibson was "concerned at the arrest of Odhikar secretary Adilur Rahman", he said in a tweeter post on Sunday.
Several rights groups including HRW and the Asian Human Rights Commission (AHRC) have issued appeals to the Bangladeshi government to release Khan.reported the AHRC.
Khan and his colleagues have been previously intimidated and followed closely by security forces for publicly criticising police brutality. In 2007, Odhikar's director, ASM Nasiruddin Elan, was picked up by security forces in Bangladesh and taken to the country's navy intelligence headquarters.Odhikar stated (pdf) that "he was physically assaulted and threatened with death" before he was released.

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

খালেদাকে নিয়ে বক্তব্যে বিরোধী দলের ‘ছিঃ ছিঃ’

‘খালেদা জিয়ার মা লক্ষ্মী রানী মারমা দার্জিলিংয়ের চা-বাগানের মালিক উইলসনের চাকরানি ছিলেন। চা বাগানের মালিকের ছিল মদ ও নারীর প্রতি আসক্তি। লক্ষ্মী রানী গর্ভবতী হলে উইলসনের দারোয়ান মুরালী মোহন মারমার সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয়। উইলসনের তত্ত্বাবধানে ১৯৪৫ সালের ১৩ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্ম হয়। খালেদা জিয়া ইহুদি ঔরসজাত। তাঁর গয়ের রং ও খাদ্যাভ্যাস তার প্রকৃত ইহুদি পিতার সঙ্গে মিল আছে। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমান ফুর্তি করতে এসে ফেঁসে গিয়ে খালেদা জিয়াকে বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তা জানজুয়ার সঙ্গে পরকীয়ায় মত্ত ছিলেন। লোকে বলে জানজুয়ার অবিকল চেহারা পেয়েছে কোকো।’
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সাংসদ অপু উকিল পাকিস্তানের সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের ‘ইন্দো-পাকিস্তান ওয়ার অব ১৯৬৫’ বই থেকে উদ্ধৃত করে বক্তব্য দেন। অপু উকিল বক্তব্য দেওয়ার সময় সিদ্দিক সালিকের লাল মলাটের বইটি উঁচিয়ে সংসদে প্রদর্শন করেন।
অপু উকিলের এই বক্তব্যের সময় বিএনপি ও জামায়াতের সাংসদরা তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং সমস্বরে ছিঃ ছিঃ ধ্বনি দেন। বিএনপির সাংসদেরা অপু উকিলের মাইক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে দাবি জানান। অপু উকিল বক্তব্য অব্যাহত রাখলে রাত আটটা ৫৭ মিনিটে বিএনপি-জামায়াতের সাংসদেরা জমিরউদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে ওয়াকআউট করেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন। অপু উকিলের বক্তব্যের সময় সরকারি দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে উত্সাহ দেন। এ সময় সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশন কক্ষে ছিলেন না। 
এর আগে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হলে তা মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই চলে। কিন্তু রাত আটটার পর বিরোধীদলীয় সাংসদ নিলোফার চৌধুরী মনি ও সরকারদলীয় সাংসদ অপু উকিলের বক্তব্যে হঠাত্ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ।

সোমবার, ২০ মে, ২০১৩

ঢাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’

বিরোধী দলকে আপাতত আর রাজপথে দাঁড়াতে দেবে না সরকার। আগামী এক মাস কোনো সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল রোববার এ ঘোষণা দিলেও কার্যত ৫ মে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির পর রাজধানীতে আর কোনো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করতে দেয়নি সরকার। এমনকি মানববন্ধনের মতো কর্মসূচির ওপরও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা চলছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় মানববন্ধন কর্মসূচি আর করতে দিচ্ছে না পুলিশ।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকার দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিল করা সরকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান বলেন, সরকার সংবিধানবিরোধী ও স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না। 
সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত জরুরি অবস্থার শামিল বলে মনে করেন প্রবীণ আইনজীবী রফিক-উল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘তবে আমি মনে করি, সরকার জরুরি অবস্থা জারি করার মতো কোনো বোকামি করবে না।’
সভা-সমাবেশ বন্ধ করে দেওয়া প্রসঙ্গে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গতকালই দুই রকম ব্যাখ্যা এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সকালে বলেছেন, যেসব দল অনুমতি নিয়ে সমাবেশ দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেয় এবং জনসাধারণের ওপর অন্যায়-অত্যাচার ও জ্বালাও-পোড়াও করে, তাদের আগামী এক মাস সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। পরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ নিষেধাজ্ঞা শুধু রাজধানী ঢাকার জন্য এবং এটা সব দলের ওপর কার্যকর হবে।
আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে এক মাস সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 
তবে এ দুটি যুক্তিকেই খারিজ করে দিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী রফিক-উল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কেউ নাশকতা চালাচ্ছে বা কোথাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো—এ অজুহাতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা উচিত হবে না। কেউ জ্বালাও-পোড়াও বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালালে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। আর অতীতে এর চেয়েও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে। কখনো সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়নি।
সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘জনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’
১৩ মে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট। ওই দিন অনুমতি না পেয়ে তা পিছিয়ে ১৫ মে করা হয়। পরিবর্তিত তারিখেও অনুমতি না পেয়ে ওই দিন সকালে সংবাদ সম্মেলন করে ১৯ মে দেশব্যাপী হরতাল ডাকে ১৮ দল। পরে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সে হরতাল প্রত্যাহার করে নেয়।
পুলিশ অনুমতি বাতিল করায় গত ১৭ মে মৎস্য ভবন চত্বরে তরিকত ফেডারেশনের মহাসমাবেশ কর্মসূচি কর্মসূচি স্থগিত করে। সর্বশেষ বামপন্থী চারটি দল—জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ ও জাতীয় গণফ্রন্টকে গত শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করতে দেয়নি পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির কর্মসূচি বন্ধ করার কৌশল হিসেবে সরকার সব দলের সভা-সমাবেশের ওপর এক মাসের এ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কারণ এক মাস পার হলে, এর কিছুদিন পর শুরু হবে রমজান মাস। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের আগ পর্যন্ত বিএনপির পক্ষে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। 
৯ আগস্ট ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ। আর ২৮ অক্টোবর থেকে আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে বড় আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মধ্য আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন
প্রথম আলোর মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল মিরসরাই উপজেলার দ্বিতীয় থানা হিসেবে বারইয়ারহাটের জোরারগঞ্জ থানা উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে সভা-সমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। বৃহত্তর রাজনৈতিক দল হিসেবে আরও বেশি আছে বিএনপির। কিন্তু তাদের সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না। এমনকি তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনেও সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না। এর কারণ কী?’ জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা সমাবেশের অনুমতি নিয়ে সমাবেশকে দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেন, জনসাধারণের ওপর অত্যাচার করেন, নির্যাতন করেন, গাড়ি পোড়ান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্র নষ্ট করেন, দোকান লুট করেন, তাঁদের যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে আমরা সমাবেশ করার অধিকার স্বীকার করা সত্ত্বেও আগামী এক মাস পর্যন্ত কোনো সমাবেশ কোনো দলকেই করতে দেব না।’
মন্ত্রীর বক্তব্যের স্পষ্টীকরণ 
গতকাল রাত ১১টায় ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের স্পষ্টীকরণ’ শিরোনামে সরকারি তথ্য বিবরণী দিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, ‘আজ মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানা উদ্বোধনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের স্পষ্টীকরণের লক্ষ্যে জানানো যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যদি কোনো রাজনৈতিক দল এমন কোনো কর্মসূচি দেয় যাতে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা নাশকতার আশঙ্কা থাকে বা সেরূপ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার স্বার্থে সেসব দলের সভা-সমাবেশের কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেবে না সরকার।’ তথ্য বিবরণীতে আরও বলা হয়, ‘সাধারণ সমাবেশ করার ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই। এটা কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং জনগণের জানমাল রক্ষার্থে পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই।’ 
বিভিন্ন দলের নিন্দা
আগামী এক মাস সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। গতকাল রোববার পৃথক বিবৃতিতে দলগুলো সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী’ আচরণ বলে মন্তব্য করেছে।
গতকাল গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে মিছিল-সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করতে ২৮ মে সচিবালয় ঘেরাও ও ২৩ মে মিরপুরে সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
গণসংহতি আন্দোলনের এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, সরকার তার অপশাসন-দুর্নীতি-লুটপাট ঢাকতে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন কর্মসূচি চাপা দিতে সভা-সমাবেশের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ ছাড়া সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ ছাত্রশক্তি।


http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-05-20/news/353602

শনিবার, ১১ মে, ২০১৩

তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় ৯০% মানুষ !!!



আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সম্পন্ন করার ব্যাপারে দেশের মানুষ প্রায় একযোগে মত দিয়েছে।

প্রথম আলোর উদ্যোগে পেশাদার জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থা ওআরজি-কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, আগের বছরগুলোর তুলনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে জনমত এখন আরও জোরালো। বেশির ভাগ মানুষ মনে করছেন, দেশের পরিস্থিতি হতাশাব্যঞ্জক। দেশের সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে মানুষের মতামত যাচাইয়ের জন্য গত ৯ থেকে ২০ এপ্রিলের মধ্যে এ জরিপ পরিচালনা করা হয়।
অধিকাংশ মানুষ এ কথা মনে করছেন যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় রায় ঘোষণার পর পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিপক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মত পাওয়া গেছে।
নির্বাচনকালীন সরকার, দেশের চলমান পরিস্থিতি ও এই প্রেক্ষাপটে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ, জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেনা হস্তক্ষেপের শঙ্কা এবং বিতর্কিত বিভিন্ন দলের সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জোটবদ্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে এই জরিপে মানুষ তাদের মতামত জানিয়েছেন। এসব মতামতে দেশের এক সংশয়পূর্ণ ছবি ফুটে উঠেছে।
জরিপটি পরিচালিত হয় দেশের প্রতিটি প্রশাসনিক বিভাগের ৩০টি জেলা শহর ও গ্রামের তিন হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর। বাংলাদেশের জনবিন্যাস অনুযায়ী উত্তরদাতাদের অনুপাত প্রতিনিধিত্বশীল রাখা হয়।
বিশ্বের বহু প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম ও জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতিতে জনমত যাচাই করে থাকে। ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর অপিনিয়ন অ্যান্ড মার্কেট রিসার্চের (ইসোমার) আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নৈতিক মানদণ্ড অক্ষুণ্ন রেখে জরিপটি করা হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নির্দলীয় অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন চায়। এই দাবির পক্ষে মানুষের সংখ্যা এখন ৯০ শতাংশ। ২০১১ ও ২০১২ সালের জনমত জরিপেও মানুষের এ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আগের জরিপের প্রায় অর্ধবছরের ব্যবধানে এর পক্ষে যথেষ্ট হারে জনমত বেড়েছে।
বেশির ভাগ মানুষ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অর্ধেক মানুষ বলেছে, দেশ অত্যন্ত খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাকি অর্ধেকের মধ্যেও ৩৫ শতাংশ মানুষের ধারণা, দেশ খারাপ অবস্থা পার করছে। এতে করে দেখা যায়, মোট ৮৫ শতাংশ মানুষ দেশের অবস্থা খারাপ বলে মনে করছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যে সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি, এও তাদের হতাশার অন্যতম কারণ।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তির সময় পরিচালিত জরিপে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এই প্রত্যাশা ছিল যে, ভবিষ্যতে হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতায় ভরা নৈরাজ্যকর অবস্থা আর ফিরে আসবে না। পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের এ আশাবাদে ক্রমাগত ভাঙন ধরেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে কাদের মোল্লা ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর সারা দেশে যে তীব্র হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে, ৭৯ শতাংশ মানুষ মনে করে, সরকার তা সামলাতে পারেনি। খুব কমসংখ্যক মানুষই বলেছে যে সরকার সুষ্ঠুভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের জরিপে বিপুল সংখ্যায় মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি করে এবং মহাজোট সরকার এ বিচারের কাজ সম্পন্ন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা জানায়।
এবারের জনমত জরিপে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে মত দিয়েছে।(64.8%)
শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা। পক্ষান্তরে এর বিপক্ষে মত দিয়েছে অর্ধেকের সামান্য কিছু বেশি মানুষ। জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন মানুষ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন সম্পর্কে জানে না।
শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে তাদের আন্দোলন শুরু করে। পরে প্রধান বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী তাদের নিয়ে সমালোচনামুখর হয়ে উঠলে এবং তাদের সম্পর্কে নানা অপপ্রচার চললে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়।
বেশির ভাগ মানুষ বিতর্কিত দলের সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্রব ও সম্পর্ক অপছন্দ করে। অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির এবং বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোটবদ্ধ থাকার বিপক্ষে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে পক্ষে-বিপক্ষে মানুষের মতামত প্রায় কাছাকাছি। তবে এর মধ্যেও কিছু বেশি সংখ্যক মানুষ মনে করে তেমন কোন আশঙ্কা নেই। বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে—প্রায় প্রতি চারজনের একজন—বলেছে যে, এ ব্যাপারে তারা কিছু বলতে চায় না বা কিছু জানে না।

http://www.prothom-alo.com/imagefiles/Opinion_Poll_April_2013.pdf

শুক্রবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

পদ্মায় মান ডুবলেও আশা ডোবেনি


বিশ্বব্যাংক সরকারকে যে ‘বাঁশ’ দিয়েছে, তা দিয়ে সেতু না হোক, সাঁকো নির্মাণের চেষ্টা করে দেখতে পারে সরকার। পরিহাস হলো, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামও সাকো ইন্টারন্যাশনাল। হিন্দু ঐতিহ্যে কেউ মারা গেলে তাঁর নামের ওপরে চন্দ্রবিন্দু যোগ করার একটা রীতি ছিল। সেই অর্থে সাকো ইন্টারন্যাশনালকে আমরা ‘সাঁকো ইন্টারন্যাশনালও’ ডাকতে পারি। সাকো নতুন করে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংকে ‘ইন্টারন্যাশনাল’ করেছে। এই কাণ্ডকারখানায় জিতল বিশ্বব্যাংক ও সাকো, হারল বাংলাদেশ। 
পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের দেশীয় প্রতিপক্ষ কে? এক কথার উত্তর, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সাহেব স্বয়ং। তাঁর পেছনে কোন কোন ব্যক্তি আছেন, আমরা জানি না। তবে দেখা যাচ্ছে, আবুল হোসেন এবং গংয়ের গোলানো কালিমা সরকার নিজের গায়ে মেখে গর্ব করছে যে, আমরা বিশ্বব্যাংককে ‘না’ করে দিয়েছি! অপমানে যিনি হাসতে পারেন, তিনি মহান। কিন্তু আমাদের মনে পড়ছে এই কথাটা, সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি? 
হাসির প্রশ্নটা আসছে, কারণ বিশ্বব্যাংক প্রথমে চুক্তি বাতিল করেছে, তারপর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে পাবলিক স্তরে প্রচার করেছে, নিজস্ব তদন্ত দল পাঠিয়ে হম্বিতম্বি করেছে। এর সবকিছুতেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে, দেশ হিসেবে হেয় হলেও সরকারের গর্বের কমতি হয়নি। বরং অর্থমন্ত্রীর অক্ষয় হাসিমুখ দেখে আমাদেরও হাসি পেয়েছে। 
সর্বশেষ আবুল হোসেনকে মামলার বাইরে রেখে বিশ্বব্যাংককে সরে দাঁড়ানোর বৈধতা জুগিয়েছে দুদক। যদি দুর্নীতি হয়েছে বলে স্বীকার করি, তাহলে গোড়াতেই ব্যবস্থা নিলে এত বিপর্যয় হতো না। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে তাজরীনের মালিক দেলওয়ার হোসেনের সাফাই গাইছেন, তখন সরকারের অনেক কর্তাব্যক্তি আবুল হোসেনের সাফাই গাইতে কসুর করেননি, বিব্রত বোধ করেননি। সচিব দুর্নীতি করেছেন অথচ মন্ত্রী জানেনই না, তা শিশুও বিশ্বাস করবে না। এতভাবে সেতু প্রকল্পকে অনিশ্চিত করার পর, নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার পর এখন বিশ্বব্যাংককে ‘না’ বলায় কিছু রক্ষা হয় না। বরং এই ‘না’ দুর্নীতির পরোক্ষ স্বীকারোক্তিই হয়ে দাঁড়াল। কারণ সরকার বলতে পারছে না, দুর্নীতি হয়নি। বলতে পারছে না, আবুল হোসেন নির্দোষ। বলতে পারছে না, বিশ্বব্যাংক এখতিয়ারের বাইরে ক্ষমতাচর্চা করেছে। পারছে না নিজের দোষে। এই দোষের দোষী বাংলাদেশের জনগণ হতে রাজি হবে না। সরকার এখানে জাতীয় স্বার্থ দেখার বদলে ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর স্বার্থকেই বড় করে দেখেছে। এটা ঢাকতে গোপনে আপস করার চেষ্টা করেছে, আর জনসভায় করেছে বড়াই। কারণ যা-ই হোক, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত একজনকে বাঁচাতে সরকার এখানে দেশের ভাবমূর্তি জলাঞ্জলি দিল। অন্যদিকে, বিএনপি জোটের আচরণ ছিল পোড়া গুদামের আলুতে লবণ লাগিয়ে খাওয়ার মতো। সরকারের অপদস্থতায় তারা খুশি হয়েছে, দেশের ক্ষতির কথা চিন্তাই করেনি। 
এভাবে দুর্নীতির পাঁয়তারার অভিযোগে পুরো প্রকল্পই বাতিল করে দেওয়ার নজির বিশ্বে বিরল। ভারতে বিশ্বব্যাংকের ঋণে এইডস পরীক্ষার যন্ত্র কেনায় বিরাট দুর্নীতি হলেও প্রকল্প বাতিল হয়নি। প্রকল্পও চলছে, দুর্নীতির তদন্তও চলছে। বিশ্বব্যাংক এমন বৈরিতা চীন বা মালয়েশিয়ার সঙ্গে করার সাহস করত না। কারণ, সেসব দেশের সরকারের কোমরের জোর আর আত্মসম্মান অনেক বেশি। এ রকম আনাড়িপনা কোনো কাজেরই না। এমন না যে ভারত বা চীনে দুর্নীতি একেবারে কম। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক এমনটা করতে পেরেছে, সরকারের অদক্ষতা, বালখিল্য ও দুর্নীতিবাজদের ঢাল হওয়ার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের অন্য কোনো রাজনৈতিক অভিপ্রায়ও থাকা অসম্ভব নয়। ড. ইউনূসের সঙ্গে সরকারের আচরণও এই বৈরিতায় ইন্ধন জুগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এসব কথা আজ কে শুনবে?
বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের তরফে যখন বারবার বলা হচ্ছিল, যমুনা সেতু বানাতে পারলে পদ্মা সেতুও নিজস্ব অর্থায়নে বানানো সম্ভব। পাঁচ বছরে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, বছরওয়ারি হিসেবে তা বহনের সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে। বৈদেশিক রিজার্ভ, রেমিট্যান্স-প্রবাহ ইত্যাদি সেই আশাবাদের ভিত্তি হতে পারত। প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ করে দিলেও কাজ হতো। উপায়ের অভাব ছিল না, অভাব ছিল পরিকল্পনার আর ব্যবস্থাপনার সামর্থ্যের। অথচ কিনা সরকার দলীয়ভাবে চাঁদা সংগ্রহের ঘোষণা দিল। সেই চাঁদা আদায় নিয়ে রাজশাহীতে ছাত্রলীগের দুই পক্ষ মারামারিও বাধাল। এমন সব হাস্যকর কর্মকাণ্ড কেবল ছাত্রলীগই দেখায়নি, সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বও দিনের পর দিন দেখিয়ে গেছে। এসবের কোনো প্রয়োজন ছিল না। 
বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনেক পুরোনো। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টিগলিজসহ অন্যরা সেসব দুর্নীতির বিষয়ে বই ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশেও গত বিএনপি সরকারের আমলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে হাটিকুমরুল সড়ক নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোয় বিশ্বব্যাংক বহু অপকর্ম করে থাকে। এসবের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ বিশ্বব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের বেলায় ঘটল উল্টোটা। বিশ্বব্যাংকেরই ঠেকা ছিল বাংলাদেশের মতো দেশকে ঋণ দেওয়ার। এটাই তাদের ব্যবসা। কিন্তু এখন আমরাই ঠেকে গেলাম।
দুর্নীতি সমস্যা। কিন্তু আরও বড় সমস্যা দুর্নীতিকে জায়েজ করানোর রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আয়োজন। যে বাংলাদেশ ‘তলাহীন ঝুড়ি’ বদনাম ঘুচিয়ে প্রবৃদ্ধি সাতের ঘরে নেওয়ার মুখে। যে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সামাজিক সেবাসূচকে ভারতের থেকে এগিয়ে, সবচেয়ে উন্নয়নশীল ২০টি দেশের তালিকায় ওপরের দিকে, সেই বাংলাদেশ কেবল রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও অপরিণামদর্শিতার জন্য এ রকম হেনস্তা হতে পারে না। 
ওপরে বলা সাফল্যের শিরোপাগুলি কিন্তু বিশ্বব্যাংকেরই দেওয়া। তাহলে তারাই কেনবা আবার বাংলাদেশকে এমন ব্যর্থ করে দেওয়ায় ব্যতিব্যস্ত হলো? এই প্রশ্নের উত্তর জনগণকেই খুঁজতে হবে। 
বাংলাদেশের সমস্যা নিচে নয়, ওপর মহলে। যে-ই সরকারে বসুক, তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জনগণের বা বাংলাদেশের সার্বিক অর্জনের মানের চেয়ে নিচু। কোনো দেশের ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব যদি সে দেশের জনগণের শিক্ষক ও দিশারি না হয়ে তাদের থেকে নিম্নমানের হয়, তাহলে এমন ধারাই ঘটে। নেতারা আমাদের দায় নেবেন কী, তাঁরাই এখন আমাদের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন! পদ্মা-নাটকে এই সত্যই আবারও ভেসে উঠল। প্রয়াত চিন্তক আহমদ ছফার কথাই আবার ফলে গেল। বহু আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন জেতে কেবল একাই জেতে। কিন্তু যখন হারে, সবাইকে নিয়ে হারে।’ বিশ্বব্যাংকের কাছে এই হার, কেবল দলীয় বা সরকারি হার নয়, এ আমাদের জাতীয় হার। 
কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। এখনো সুযোগ আছে। সরকার যদি বাদবাকি সময়ে দক্ষ, যোগ্য ও সত্ মানুষদের নিয়ে পরিকল্পনা করে প্রকল্প শুরু করতে পারে, যদি নিজেরাই টাকা ও বুদ্ধি জোগাতে পারে, তাহলে যা ছিল মন্দ, তাই হয়ে উঠবে শুভ। আমাদের কেবল একটা বড় দৃষ্টান্ত চাই। নিজেদের এই সুযোগটা সরকারের করে দেওয়া উচিত। অবকাঠামো নির্মাণ যেকোনো দেশের উন্নতির ভিত্তি। আমরা যদি আমাদের যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতকে মোটামুটি দুর্নীতিমুক্ত করতে পারি, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক নীতি গ্রহণ করতে পারি, তাহলে অন্য খাতের দুর্নীতি সত্ত্বেও দেশ এগিয়ে যাবেই। ভারত এভাবে করেছে। তার জন্য শাসক মহলকে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে, কম-বেশি টাকা বানানো বন্ধ করা না গেলেও অন্তত গ্যাস ও বিদ্যুত্ এবং পদ্মা সেতুকে দুর্নীতির আওতার বাইরে রাখব। এটা হবে আমাদের অবস্থান উজ্জ্বল করার পরীক্ষা ক্ষেত্র। এ ব্যাপারে যদি গোল্ডেন ফাইভ না পেয়েও কেবল জিপিএ-ফাইভ পাই, তাতেও চলবে। আমাদের নীতি হোক কম, কিন্তু ভালো করে। এটা একবার করতে পারলে, ঋণ দেওয়ার দেশের বা ব্যাংকের অভাব হবে না বিশ্বে। 
যমুনা সেতু এক সরকার শুরু করেছে, আরেক সরকার শেষ করেছে। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হতে পারে। যোগাযোগ খাত প্রধান সেই খাত, যেখানে গত ৩০ বছরে সরকার বদলালেও কর্মসূচির বাস্তবায়নে পরম্পরা বিরাজ করেছে। পদ্মা সেতুর বেলায়ও সেটাই হওয়া উচিত। বর্তমান সরকার শুরু করুক, পরে যে আসবে সে শেষ না করে পারবে না। শত হতাশার মধ্যেও এই একটা গাইডলাইন অনুসরণ যদি করতে না পারে, তাহলে সরকার ভোটও হারাবে, মানও হারাবে। মান গেলেও আজকাল অনেক কিছু থাকে, ভোট গেলে কী থাকে তার নজির বর্তমান বিরোধী দল। আপনারা কি সেটা চান? না চাইলে আজই শুরু করে দিন, জনগণ এই একটা ক্ষেত্রে আপনাদের পাশে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক। পরীক্ষা করেই দেখুন না প্রধানমন্ত্রী।


ফারুক ওয়াসিফ
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-02-01/news/325851